সোনালী আঁশের সুদিন কী আবার ফিরবে

বাজারে ভালো দাম আর চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় সোনালি আঁশের সোনালী রঙে ভরে উঠছে কৃষকের ঘর। উন্নত জাত আবিষ্কার, উচ্চ ফলন ও ভালো দাম পাওয়ায় পাট চাষে কৃষকের আগ্রহ বাড়ছে। বিগত বছর গুলোতে লোকসানে পড়া কৃষকদের মুখে ফুটে উঠেছে সন্তুষ্টির হাসি। সরকার বন্ধ পাটকলগুলো পুনরায় চালুর পাশাপাশি পাটের বহুমুখি ব্যবহারের প্রতি গুরুত্ব দিয়েছেন।

সরেজমিন খোঁজ নিয়ে জানাগেছে, প্রায় দুই বছর ধরে সরকারী ২৫টি পাটকল বন্ধ থাকলেও পাটের দামে এবার কৃষকের মুখের হাসি ফিরেছে। করোনা মহামারীর মধ্যে আগের যে কোন সময়ের তুলনায় পাটের দাম বেশি পাচ্ছেন কৃষক। এ বছর বিভিন্ন এলাকায় প্রতিমণ পাট বিক্রি হচ্ছে আড়াই হাজার থেকে সাড়ে তিন হাজার টাকায়। কোথাও কোথাও চার থেকে সাড়ে চার হাজার টাকা দামেও প্রতিমণ পাট বিক্রি হচ্ছে।

বাংলাদেশে পাট দিয়ে পাট সূতা, দড়ি, বস্তা, প্যাকিং সরঞ্জাম, ব্যাগ বা থলে, হাতে বাছাই করা আঁশ, পাটজাত কাপড় বহুদিন ধরে তৈরি হয়। এখন সেই সঙ্গে পাটের তৈরি বৈচিত্র্যময় পণ্যের রপ্তানিও বেড়েছে। পাটের তৈরি টব, খেলনা, জুট ডেনিম, জুয়েলারি, ম্যাটস, নারী-পুরুষের জুতা স্যান্ডেল, বাস্কেট, পাটের শাড়ি, পাঞ্জাবি ও পাটের তৈরি গৃহস্থালি নানা সরঞ্জামের বিদেশে চাহিদা তৈরি হয়েছে। প্রধানত আমেরিকা ও ইউরোপীয় দেশগুলোয় এই জাতীয় পণ্য রপ্তানি করা হয়। আফ্রিকান দেশগুলো বস্তা ও পাটজাত দড়ি বেশি রপ্তানি হয়। পাটের আঁশের পাশাপাশি পাটখড়িরও একটি বড় বাজার তৈরি হয়েছে। এসব পণ্য দিয়ে পার্টিকেল বোর্ড, কম্পোজিট, সেলুলয়েডে ব্যবহার হয়।

এ বছর পাটের বীজ বপন ও পরবর্তীতে বৃষ্টিপাত হওয়ায় পাটের ভাল ফলন হয়েছে এবং পাট সহজেই জাগ দিতে পেরেছেন কৃষকেরা। তবে উত্তরাঞ্চলের কোন কোন জায়গায় পানি না থাকায় পাটগাছ জাগ দিতে কিছুটা বিপাকে পড়তে হয়েছিল কৃষকদের। পরবর্তীতে বৃষ্টি হওয়ায় সেই সমস্যা কেটে গেছে। ঠিকমতো পাট কেটে জাগ দিয়ে আঁশ ছাড়িয়ে শুকিয়ে সেই পাট এখন বাজারে বিক্রির ধুম পড়েছে।

দেশে পাটকল বন্ধ হলেও বিশ্বব্যাপী এর চাহিদা বাড়ছে। এ কারণে বাড়ছে রফতানিও। পাশাপাশি পাট দিয়ে এখন বহুমুখী পণ্য তৈরি হচ্ছে। ফলে দেশেও পাটপণ্য উৎপাদন হচ্ছে আগের চেয়ে অনেক বেশি। সব মিলিয়ে পাট নিয়ে এখন আর কৃষকের দুশ্চিন্তা নেই। বরং পাট বিক্রি করে কৃষক এত মুনাফা পাবেন কোনো দিন চিন্তাই করতে পারেননি। এক সময়ে দেশে যেখানে পাটের সর্বনিম্ন মূল্য বেঁধে দেয়ার জন্য কৃষকের পক্ষ থেকে দাবি উঠত, সেখানে এখন শিল্প মালিকদের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ মূল্য বেঁধে দেয়ার দাবি উঠছে। যদিও কাঁচা পাটের দাম বেড়ে যাওয়ায় খুশি নন বেসরকারী পাটকল মালিকরা। তারা বলছেন, এত বেশি দামে পাট কিনে পণ্য উৎপাদন করে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা সম্ভব নয়। এতে দেশে পাট পণ্যের উৎপাদন কমে যাবে।

ফরিদপুরের পাট চাষি আছাদ গত বছর পর্যন্ত যে জমিতে ধান চাষ করেছেন। সেই জমিতে এবার পাট চাষ করেছে। তিনি বলেন, দুই বিঘা জমিতে চাষ করেছিলাম। বিক্রি করে ভালো লাভ হইছে। অনেক বছর পর আবার জমিতে পাট চাষ ভালো হয়েছে।

বেড়েছে পাটের চাষ

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে এই বছর সাড়ে আট লক্ষ হেক্টর জমিতে পাটের চাষ হয়েছে। উৎপাদন হয়েছে কম-বেশি ৯০ লাখ বেল (১৮২ কেজিতে এক বেল)। প্রতি বিঘায় গড়ে নয় মণ পাট চাষ হয়েছে। বেশিরভাগ স্থানে প্রতি মণ পাট বিক্রি হয়েছে তিন হাজার টাকার ওপরে।
বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইন্সটিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, ২০১০ সালে ৭ দশমিক শূন্য ৮ হেক্টর জমিতে পাটের চাষ হয়েছিল। সেই বছর মোট উৎপাদন হয়েছিল ১৫ দশমিক ২৬ লাখ মেট্রিক টন। সেই হিসাবে এই বছর উৎপাদন দাঁড়াতে যাচ্ছে প্রায় সাড়ে ১৬ লাখ মেট্রিক টন।

বাড়ছে পাটের চাহিদা

বাংলাদেশের পাট গবেষণা ইন্সটিটিউটের তথ্য মতে, সারা বিশ্বে এখন প্লাস্টিক বা সিনথেটিক ফাইবার বাদ দিয়ে ন্যাচারাল ফাইবারের একটা ডিমান্ড তৈরি হয়েছে। নানা ধরণের পণ্য তৈরি হচ্ছে। বাংলাদেশে এই খাতে অনেক প্রাইভেট সেক্টর তৈরি হয়েছে, বিনিয়োগ হয়েছে, যারা পাট দিয়ে পণ্য তৈরি করে বিদেশে রপ্তানি করছে। ফলে এই খাতে একটা প্রতিযোগিতার বাজার তৈরি হয়েছে। তারা কৃষকের কাছ থেকে বেশি দামে পাট কিনছে। তাই পাটের চাহিদাও বাড়ছে, দামও বেড়েছে। ভালো দাম পাওয়ার কারণে কৃষকরাও পাট চাষের প্রতি আরও বেশি আগ্রহী হয়ে উঠেছে বলে তিনি জানান। তিনি জানান, গত বছরের আগে পাটের সর্বোচ্চ মূল্য উঠেছিল আড়াই থেকে তিন হাজার টাকা। কিন্তু গত বছর সর্বোচ্চ ছয়-সাত হাজার টাকা দরেও পাটের মণ বিক্রি হয়েছে।
পাট খাতের সাথে সংশ্লিষ্টরা জানাচ্ছেন, প্রতিবেশী ভারতেও পাটের বড় একটি বাজার রয়েছে। বাংলাদেশ থেকে ভারতে কাঁচা পাট রপ্তানির পাশাপাশি অবৈধ পথেও পাট পাচার হয়ে যায় বলে তারা বলছেন।

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, এক যুগের রেকর্ড ভেঙ্গে ২০২০-২০২১ অর্থবছরে বাংলাদেশ পাটজাত দ্রব্য রপ্তানি করে ১১৬.১৪ কোটি ডলার বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করেছে। আগের বছরের তুলনায় গত বছর পাটজাত পণ্য রপ্তানি বেড়েছে ৩১ শতাংশ।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের তথ্য মতে, এ বছর সারাদেশে সাত লাখ ২৬ হাজার হেক্টর জমিতে ৮২ লাখ টন পাট উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ছিল। তবে দেশে এবার আট থেকে সাড়ে ৮ লাখ হেক্টর জমিতে পাট চাষ হয়েছে। আর এ থেকে ৯০ লাখ বেল পাটের আঁশ উৎপন্ন হবে বলে আশা করা হচ্ছে। দেশে উৎপাদিত পাটের আঁশের প্রায় ৫১ শতাংশ পাটকলগুলোয় ব্যবহৃত হয়, ৪৪ শতাংশের মতো কাঁচা পাট বিদেশে রফতানি হয় এবং মাত্র ৫ শতাংশের মতো লাগে ঘর-গৃহস্থালি আর কুটির শিল্পের কাজে।

কৃষি তথ্য সার্ভিসের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে নব্বইয়ের দশকে পাট হতো ১২ লাখ হেক্টর জমিতে। মাঝে তা ৪ থেকে সাড়ে ৪ লাখ হেক্টরে নেমে যায়। কিন্তু প্রাকৃতিক আঁশের চাহিদা বাড়ায় ২০১০-১৫ সাল নাগাদ চাষের এলাকা বেড়ে ৭ লাখ হেক্টরে পৌঁছায়। এরপর থেকে তা আরো বাড়ছে। আগে ১২ লাখ হেক্টর এলাকা থেকে যে পরিমাণ পাট পাওয়া যেত, উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহারের কারণে এখন ৭-৮ লাখ হেক্টর জমি থেকেই তার চেয়ে বেশি পাওয়া যাচ্ছে বলে কৃষি কর্মকর্তারা জানান।

২০১৮-১৯ অর্থবছরে সাত লাখ ৪৯ হাজার হেক্টর জমিতে পাট আবাদ হয়। সেখান থেকে ৮৫ লাখ ৭৬ হাজার টন পাট উৎপাদন হয়েছিল। কিন্তু ২০১৯-২০ অর্থবছরে উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা কমিয়ে ছয় লাখ ৯৯ হাজার হেক্টর করা হয়। ধারণা করা হয়েছিল, সেখান থেকে ৮০ লাখ টন পাট পাওয়া যাবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ছয় লাখ ৭৯ হাজার হেক্টর জমিতে পাট চাষ হয়। সেখান থেকে ৮০ লাখ টন পাট উৎপাদিত হয়।

পাট গবেষণা ইনস্টিটিউটের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মোঃ মাসরুর আনোয়ার বলেন, দেশে পাটকল বন্ধ হলেও বিশ্বব্যাপী পাটের চাহিদা বাড়ছে। পাট পরিবেশ বান্ধব হওয়ায় এর রফতানি চাহিদাও বাড়ছে। পাশাপাশি দেশেও পাটপণ্য উৎপাদন হচ্ছে আগের চেয়ে অনেক বেশি। তাই বলা চলে পাটের সুদিন ফিরেছে।