‘বেশিরভাগ নারী এখনো অনেক বৈষম্যের শিকার’

বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের ৫২তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষ্যে এক আলোচনা সভায় বক্তারা বলেছেন, গোটাকয়েক নারীর প্রেক্ষাপট ভিন্ন হলেও আশেপাশের ঘটনা থেকে বোঝা যায় বেশিরভাগ নারী এখনো অনেক বৈষম্যের শিকার। একটি বৈষম্যের সাথে অন্য একটি বৈষম্যের জোরালো সম্পর্ক থাকে। গতানুগতিক পেশার বাইরে কাজ করতে যেয়ে দেখা যায় একটা মেয়ে চিরাচরিত নানা বাধার সম্মুখীন হয়।

বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের ৫২তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালন উপলক্ষ্যে গৃহীত বিভিন্ন কর্মসূচি পালনের ধারাবাহিকতায় শনিবার (৯ এপ্রিল) ‘বৈষম্যকে চ্যালেঞ্জ করি, সমতার চেতনা প্রতিষ্ঠা করি’ এই প্রতিপাদ্যটিকে সামনে রেখে আলোকে পেশাজীবি তরুণীদের সাথে অনলাইনে আলোচনা সভায় একথা বলেন তারা।

অনলাইন আলোচনা সভায় সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশমহিলা পরিষদের সভাপতি ডা. ফওজিয়া মোসলেম। সভায় প্রারম্ভিক বক্তব্য রাখেন সাংগঠনিক সম্পাদক উম্মে সালমা বেগম এবং স্বাগত বক্তব্য রাখেন যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সীমা মোসলেম।

এবিষয়ের উপর আলোচনা করেন মিডিয়া ব্যক্তিত্ব ও আবৃতি শিল্পী শারমিন লাকি। তরুন প্রজন্মের বিভিন্ন পেশাজীবী নারীদের মধ্যে আরো আলোচনা করেন থিংক স্পেস ইন্টারিওর স্টুডিও এর ইন্টারিওর আর্কিটেক্ট এন্ড কো ফাউন্ডার লাভা বিশ্বাস নন্দিনী, দয়ীতার সত্ত্বাধিকারী সাইদা সুলতানা মিলি, ট্রান্সজেন্ডার অধিকার কর্মী ও নৃত্যশিল্পী সঞ্জীবনী, এ্যাকশন এইড বাংলাদেশের প্রোগ্রাম অফিসার, (উইমেন রাইটস এন্ড জেন্ডার ইকুয়ালিটি) ফৌজিয়া আফরোজ, ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের উইমেন সাপোর্ট এন্ড ইনভেস্টিগেশন ডিভিশনের এডিশনাল ডেপুটি পুলিশ কমিশনার লায়লা ফেরদৌসী, কোডিজাইন সফটওয়ার ডেভেলপমেন্টের বিজনেস ডেভেলপমেন্ট ম্যানেজার হৈমন্তী খান, দলিত নারী ফোরামের প্রোগ্রাম অফিসার তামান্না সিং বারাইক।

মিডিয়া ব্যক্তিত্ব ও আবৃতি শিল্পী শারমিন লাকি বলেন, নারীর প্রতি বৈষম্য দূর করতে বাংলাদেশের মহিলা পরিষদ সবসময় সাহসিকতার সাথে কাজ করছে। এতবছর সফলভাবে ও সার্থকভাবে সংগঠন যে পথ পাড়ি দিয়েছে তারজন্য প্রশংসার দাবিদার।

শারমিন লাকি বলেন, যতদিন না নারীরা মর্যাদা পাবে, নারীদের আমরা মানুষ হিসেবে ভাবতে না শিখব ততদিন বৈষম্যকে দূর করা সম্ভব নয়। এজন্য নারীকেও সচেতনভাবে এগোতে হবে, পরিবার থেকেই এই বৈষম্যদূরের কাজ শুরু করতে হবে।

উপস্থিত আলোচকরা বলেন, গোটাকয়েক নারীর প্রেক্ষাপট ভিন্ন হলেও আশেপাশের ঘটনা থেকে বোঝা যায় বেশিরভাগ নারী এখনো অনেক বৈষম্যের শিকার। একটি বৈষম্যের সাথে অন্য একটি বৈষম্যের জোরালো সম্পর্ক থাকে। গতানুগতিক পেশার বাইরে কাজ করতে যেয়ে দেখা যায় একটা মেয়ে চিরাচরিত নানা বাধার সম্মুখীন হয়। নারী আসলেই কাজ পারবে কি-না এমন প্রশ্নসূচক দৃষ্টিভঙ্গি অনেকের মধ্যে দেখা যায়। প্রযুক্তিগত কাজের ক্ষেত্রে এখনো পুরুষের আধিপত্যই আছে। নারীর উচ্চ পর্যায়ের দায়িত্বে থাক অনেক পুরুষই মেনে নিতে পারেনা। মতামত নেয়াকে গুরুত্ব দেয়া হয়না। দৈনন্দিন জীবনযাপনে অনেক রকমের বৈষম্যের মুখোমুখি হতে হয় যাকে বৈষম্যকারীরা সহজাত বলে মনে করে।

তারা আরো বলেন, সমতা ও সাম্য এর ধারণা স্পষ্ট করতে হবে। পরিবারে সমাজে, শিক্ষাক্ষেত্রে এবং কর্মক্ষেত্রে ট্রান্সজেন্ডারদের জেন্ডার আইডেন্টিটি নিয়ে এখনো অনেক চ্যালেঞ্জ ফেস করতে হয়, যা কোনোভাবেই কাম্য নয়। অন্যদিকে দলিত জনগোষ্ঠী প্রায় ২০০ বছর ধরে বৈষম্যের শিকার, যা ব্রিটিশ শাসকগোষ্ঠী কর্তৃক চাপিয়ে দেয়া হয়েছে।

সভার শুরুতে সাংগঠনিক সম্পাদক উম্মে সালমা বেগম বলেন, জন্মসূত্রে সকল মানুষ স্বাধীন এবং সমমর্যাদা লাভের অধিকারি-সার্বজনীন মানবাধিকারের এই দর্শনকে ধারণ করে ১৯৭০ সালের ৪ এপ্রিল কবি সুফিয়া কামালের নেতৃত্বে সংগ্রামী তরুণীদের উদ্যোগে গঠিত হয় বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ। প্রতিষ্ঠাকালীন সময়ে নারীমুক্তি, নারী সমাজকে অধিকার সম্পর্কে সচেতন করা, বাল্যবিবাহ, বহুবিবাহ প্রতিরোধ, যৌতুক প্রথার বিরুদ্ধে আন্দোলন এবং নারী শিক্ষা স্বাস্থ্য ও কর্মসংস্থানের জন্য আন্দোলন করেছে।

যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সীমা মোসলেম বলেন, বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ প্রতিষ্ঠার প্রেক্ষাপট ও গৃহীত কর্মসূচিসমূহ তুলে ধরে বলেন একটি স্বেচ্ছাসেবী গণনারী সংগঠন হিসেবে নারীমুক্তি, নারীর মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য বহুমুখি পদ্ধতিতে ধারাবাহিকভাবে কাজ করছে সংগঠন।

সভাপতির বক্তব্যে ডা. ফওজিয়া মোসলেম বলেন, কাজের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে বৈষম্যের বিষয়ে একেক গোষ্ঠীর নারীদের একেক রকম চিন্তাধারা এখনো আছে, এর পরিবর্তন ঘটাতে হবে। প্রত্যেকের অভিজ্ঞতার ক্ষেত্র শ্বাশত ধ্রুব সত্য নয়, প্রতিনিয়ত পরিবর্তন হয়। নারীর অগ্রগতি নানা ধরণের হচ্ছে এক্ষেত্রে পরিবর্তনগুলোকে পর্যবেক্ষণ করে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ কর্মসূচি গ্রহণ করে।