বই পোড়ার কষ্ট ভুলতে পারছে না ওরা

দুপুর তখন বারোটা। রোদ এসে হানা দিচ্ছে আগুনে পোড়া ঘরে। ছাই হয়ে যাওয়া অনেক বইয়ের পাতা চারদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। এই বইয়ের পাতাগুলো একদিন আগেও ছিল পড়ার উপযোগী। কিন্তু এখন শুধুই স্মৃতি। ধ্বংসস্তূপের অংশ সেগুলো। পড়ার উপযোগী না হলেও বইয়ের পাতাগুলো কুড়িয়ে কুড়িয়ে দেখছিল পঞ্চম শ্রেণির ছাত্রী রাত্রি আক্তার।

কেনোইবা দেখবে না? রোববার (২০ মার্চ) রাতেও শেষ সঙ্গী ছিল এই বইগুলো। ছোট ভাইকে নিয়ে ঘরের বিছানায় পড়াশোনা করছিল রাত্রি। ঠিক সে সময় তার নানি চিৎকার দিয়ে বলে, ‘রাত্রি ঘর থাইকা বের হইয়া আয়।’

তড়িঘড়ি করে বই ফেলে ছোট ভাইকে কোলে নিয়ে বেরিয়ে আসে সে। তবে আর ঘরে ফিরে যেতে পারিনি। বস্তিতে লাগা আগুন তাদের ঘরটির সঙ্গে স্বপ্নমাখা বইগুলোকেও পুড়ে ছাই করে দিয়েছে। ফায়ার সার্ভিসের আগুন নিয়ন্ত্রণের সময় ছিটানো পানিতে বইয়ের কিছু পাতা রক্ষা পেলেও তা পড়ার উপযোগী নয়।

সোমবার (২১ মার্চ) দুপুরে রাজধানীর কল্যাণপুরের ৯ নম্বর বস্তিতে গেলে কান্নাজড়িত কণ্ঠে রাত্রি বলছিল, ‘আমি এহন বই পামু কই।‌ স্যারে তো আমারে বকা দিবে।’

রাত্রি তার নানির বাড়িতে থেকে পড়াশোনা করে। রোববার দুপুরেও সে স্কুলে গেছে। কিন্তু আজ থেকে তার স্কুলে যাওয়া হবে কিনা তা নিয়ে সন্দিহান সে। মামার পুড়ে যাওয়া ঘরে বারবার ঢুকছিল আর বের হচ্ছিল। কি যেন আনমনে ভাবছে রাত্রি।

রাত্রি জানায়, আগুন লাগানোর সময় পড়াশোনা করছিল সে। হঠাৎ চিৎকার শুনে বের হয়ে আসে। সেই থেকে রোববার রাতের পর সোমবার দুপুর পর্যন্ত খোলা আকাশের নিচেই কেটেছে রাত্রির সময়। যদিও সোমবার সকাল থেকে ঢাকা জেলা প্রশাসন ছাড়াও বিভিন্ন এনজিওকর্মীরা এসে তালিকা তৈরি করছেন। কিন্তু তাদের পক্ষ থেকে দুপুর নাগাদ কোনো আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়েছে বলে বস্তিবাসীরা জানাতে পারেননি।

বইয়ের সঙ্গে স্বপ্ন যেমন পুড়েছে রাত্রির, তেমনি বইয়ের মায়া কিছুতেই ভুলতে পারছেন না শেখ ফজিলাতুন্নেছা মহিলা প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের দশম শ্রেণির ছাত্রী রাজিয়া আক্তার। জানান, খালার বাসায় থেকে পড়াশোনা চালিয়ে আসছিল সে। তাদের গ্রামের বাড়ি রাজধানীর দোহারে। ঘটনার সময় ঘরে রাজিয়া ছাড়া আর কেউ ছিল না। সে সময় সে পড়াশোনা করছিল। হঠাৎ আগুনের চিৎকার শুনে লাফিয়ে ঘর থেকে বের হয়।

পঞ্চম শ্রেণি পড়ুয়া রাত্রীদের প্রতিবেশী রাজিয়া বলেন, ‘আগুন শুইনা বের হইয়া আইলাম। বইগুলাও নিবার পারলাম না। আচ্ছা, যারা আমাগো নাম নিতাছে তারা কি আমারে বই খাতা দিবে?’

রাজিয়ার এমন প্রশ্নের কোনো উত্তর ছিল না প্রতিবেদকের কাছে। তবে একটি অনলাইন পোর্টালের এক প্রতিবেদক তাকে আশ্বস্ত করেন কেউ তাকে বই না দিলে তিনি তার বইয়ের ব্যবস্থা করে দেবেন। এমন কথা শোনার পরও অঝোরে কাঁদছিল রাজিয়া।

রাজিয়ার সঙ্গে যখন কথা হচ্ছিল, ভয়ে সে কাঁপছিল। তার ভাষ্যমতে, এমন আগুন সে আর জীবনে কখনও দেখেনি। যে আগুন তার বই পুড়িয়ে দিয়েছে, পুড়েছে বড় হওয়ার স্বপ্ন।

রাজিয়ার শুধু বই পুড়েনি, ঘরে থাকা একটি মোবাইল ফোনও পুড়ে গেছে। সপ্তাহখানেক আগে তার মা তাকে একটি গাইড কিনে দিয়েছিল। অন্যান্য বইয়ের সঙ্গে সেই গাইডটিও পুড়ে ছাই হয়ে গেছে।

দশম শ্রেণির এই শিক্ষার্থী বলেন, ‘মামারে গাইড কিইনা দিছিল। আগুন ধরার সময় পরনের কাপড়টা ছাড়া কিছু নিবার পারি নাই। আমি কি স্কুল যাবার পারুম। আইজকা স্কুল যাওয়ার কথা আছিল। স্যাররা মনে হয় শুনে নাই। শুনলে চইলা আসত।’

রাজিয়ার প্রতিবেশী হালিমা বেগমের মেয়েও পঞ্চম শ্রেণির ছাত্রী। তার ঘরে থাকা সকল জিনিসপত্রের সঙ্গে মেয়ের বইপত্রও পুড়ে গেছে। হালিমার চিন্তা একটাই, পুড়ে যাওয়া জিনিসপত্রগুলো হয়তো কেনা যাবে, কিন্তু পুড়ে যাওয়া বইগুলো কি ফিরে পাওয়া সম্ভব!

অন্যের বাড়িতে কাজ করে এবং শ্রমিক হিসেবে যা আয় হতো তা দিয়েই চলে হালিমার সংসার।‌ স্বামী একসময় কাঠমিস্ত্রির কাজ করতেন। কিন্তু অসুস্থ হয়ে বাসায় পড়ে থাকায় পুরোটাই এখন সব তিনি করেন। মেয়ের পড়ালেখার খরচ তেমন দিতে পারেন না। তাই মেয়েকে একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করান। সরকারি সেই বইগুলো পুড়ে যাওয়ায় মেয়েকে কিছুতেই বুঝাতে পারছেন না। এ জন্য তিনি বস্তিতে পুড়ে যাওয়া শিশুদের নতুনভাবে বই দেওয়ার জন্য শিক্ষকদের প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানিয়েছেন।

বস্তিতে থেকেও বড় হওয়ার স্বপ্ন দেখেন রাজিয়া-রাত্রিরা। তারা মনে করে, পুড়ে যাওয়া বইগুলো ছিল, তাদের এক একটি স্বপ্ন। আর সেই স্বপ্নের কথাই তারা ভুলবেন কি করে।

গতকাল রোববার রাত সাড়ে নয়টার দিকে বস্তিতে ওই আগুনের ঘটনা ঘটে। পরে খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের ১৪টি ইউনিট সেখানে ছুটে যায়। এরপর প্রায় পৌনে দুই ঘণ্টা চেষ্টা চালিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হন তারা। তবে এ ঘটনায় বস্তির এক নারী অসুস্থ হয়ে সেদিন রাতেই মারা গেছেন বলে জানা গেছে।

এদিকে, সোমবার দুপুরে বস্তিবাসীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, পোড়া এই বস্তিতে চার শতাধিক ঘর ছিল। রোববারের আগুনে ১৮৯টি ঘর পুড়ে ছাই হয়ে গেছে।

অন্যদিকে, সোমবার সকালে ঢাকা জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে একটি টিম ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে। তারা ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর সঙ্গে কথা বলেছেন। ঢাকা জেলা প্রশাসন আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে সহায়তা দেওয়ার জন্য একটি তালিকা তৈরি করে সরকারের কাছে পাঠাবে বলে জানা গেছে।