‘প্রাইভেটকার কমলেই কমবে যানজট’

হেলতে-দুলতে বাস চালানোয় ড্রাইভারকে দু-চার কথা শুনিয়ে দিলেন বখতিয়ার সাহেব। যদিও তার কথা ড্রাইভারের কান অবধি পৌঁছায়নি। পৌঁছালেও যে তিনি কর্ণপাত করতেন সেটা হলফ করে বলা যায় না।

বখতিয়ার সাহেব হাতঘড়ি দেখছেন আর বিড়বিড় করে কী যেন বলছেন। স্পষ্ট শোনা না গেলেও মুখের অভিব্যক্তি দেখে অন্তত আন্দাজ করা যায়, ঠিক সময়ে অফিসে পৌঁছাতে পারবেন কি না— সেই শঙ্কার ভেতর আছেন।

শুধু বখতিয়ার সাহেব নন। তার মতো লক্ষাধিক চাকরিজীবী একই শঙ্কা নিয়ে বাসে ওঠেন। যানজট যেন বার্লিন প্রাচীরের হয়ে ঠাঁয় দাঁড়িয়ে থাকে।

প্রাচীর টপকে বখতিয়ার সাহেব অফিসে পৌঁছাতে পারলেন কি না— সেদিকটায় নজর থাকবে আমাদের। তবে তার আগে চলুন দেখে নেওয়া যায় যাক ঢাকার যানজটের সাতকাহন।

বাসের থেকে হেঁটেই দ্রুত পৌঁছানো যায় গন্তব্যে
হাস্যকর মনে হলেও, ঢাকায় বাসের চেয়ে হেঁটে দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছানো যায়। ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের ‘নগর পরিস্থিতি-২০১৬: ঢাকা মহানগরে যানজট, শাসনব্যবস্থার পরিপ্রেক্ষিত’ শীর্ষক এক গবেষণার প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, বর্তমানে ঢাকার যানবাহনের গড় গতি প্রতি ঘণ্টায় ৬.৪ কিলোমিটার। কিন্তু গাড়ির পরিমাণ যদি বাড়তে থাকে তাহলে ২০৩৫ সাল নাগাদ গড় গতি প্রতি ঘণ্টায় ৪.৭ কিলোমিটারে নেমে আসতে পারে। যা প্রায় হেঁটে যাওয়ার মতো ধীরগতির।

এছাড়া ‘দ্য ফিউচার প্ল্যানিং আরবান ট্রান্সপোর্টেশন ইন ঢাকা’ শীর্ষক এক সেমিনারে বক্তারা জানিয়েছিলেন, শহরে যানবাহনের গতি মানুষের হাঁটার গতির মতো ঘণ্টায় প্রায় পাঁচ কিলোমিটারে চলে এসেছে। ১২ বছর আগেও ঢাকায় যানবাহনের এ গতিবেগ ছিল ঘণ্টায় ২১ কিলোমিটার।

ওই সেমিনারে আরও জানানো হয়েছিল, যানজটের কারণে ঢাকা মহানগরীতে দিনে ৫০ লাখ কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে কর্মজীবীদের, যার আর্থিক ক্ষতি বছরে ৩৭ হাজার কোটি টাকা।

যানজট নিরসনে বাস রুট রেশনালাইজেশন
সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে বেশকিছু পদক্ষেপ হাতে নিয়েছে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন। বাস রুট ফ্যাঞ্চাইজির আওতায় পরীক্ষামূলকভাবে একটি রুটে একক কোম্পানির অধীনে বাস চলাচল শুরু হয়েছে। ‘ঢাকা নগর পরিবহন’ নামে কোম্পানি গঠন করা হয়েছে। এর অধীনে প্রাথমিকভাবে ঘাটারচর থেকে কাঁচপুর পর্যন্ত ৫০টি বাস চলছে। গেল ফেব্রুয়ারিতে আরও ৫০টি বাস যুক্ত হওয়ার কতা থাকলেও এখন পর্যন্ত সেটা হয়নি।

কবে নাগাদ বাকি বাসগুলো রাস্তায় নামবে— এটা জানতে যোগাযোগ করা হয় ডিটিসিএর ডেপুটি ট্রান্সপোর্ট প্ল্যানার ধ্রুব আলমের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘মার্চের ২৫-২৬ তারিখের দিকে বাকি বাসগুলো নামতে পারে। তবে ৫০টি বাস নামবে কি না— সেটা বলতে পারছি না। ৪০টি বাস নামানোর সম্ভাবনা আছে।’

এছাড়া বাস রুট রেশনালাইজেশন কমিটির ২১তম সভায় আরও তিনটি রুট চালু করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে সহসাই এই নতুন তিন বাস রুট আলোর মুখ দেখছে না বলে জানালেন ধ্রুব আলম। তিনি বলেন, ‘এই প্রজেক্ট সম্পন্ন হতে কিছুটা দেরি হবে। অবকাঠামোগত সম্ভাব্যতা যাচাই করা হচ্ছে। আগামী ২২ মার্চ মিটিং আছে, তখন এটা নিয়ে আলোচনা হবে।’

এছাড়া যানবাহনের চাপ কমাতে ঢাকার প্রবেশপথে চারটি আন্তঃজেলা বাস টার্মিনাল ও বাস ডিপো স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এগুলো নির্মিত হওয়ার পর কোনও দূরপাল্লার বাস রাজধানীতে প্রবেশ করতে পারবে না।
সরকারের এই উদ্যোগটির তত্ত্বাবধানে রয়েছেন ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষের অতিরিক্ত নির্বাহী পরিচালক (টিএমপিটিআই) মোহাম্মদ রবিউল আলম। তিনি বলেন, ‘ফিজিবিলিটি স্টাডি অ্যান্ড কনসেপ্ট রিপোর্ট হাতে পেয়েছি। অগ্রগতি বলতে এতটুকু হয়েছে। রিপোর্ট অনুযায়ী আমরা কর্মপরিকল্পনা নির্ধারন করব। সামনে মিটিংয়ে রিপোর্ট নিয়ে কথা হবে।’

কবে নাগাদ বাস্তবায়িত হবে— জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘নির্দিষ্ট কোনও সময় বলা সম্ভব না। ঢাকার বাইরে বাস টার্মিনাল স্থানান্তর করা সহজ কাজ নয়। ল্যান্ডিং পজিশন, ডিটেইল ডিজাইনসহ নানা বিষয় জড়িত আছে। সময় তো লাগবেই।’

তিনি জানান, আন্তঃজেলা বাস টার্মিনাল নির্মাণের জন্য দশটি জায়গা নির্ধারণ করা হয়েছে। এরমধ্যে চারটি জায়গা চূড়ান্ত হতে পারে। দ্রুত সময়ের মধ্যে ঢাকার বাইরে বাস টার্মিনাল স্থানান্তর করা হবে।

বিশেষজ্ঞরা যা বলছেন
করোনা পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হওয়ায় পুরোদমে চলছে অফিস-আদালত, স্কুল-কলেজ। ফলে সপ্তাহ দুয়েক ধরে রাজধানীজুড়ে তীব্র যানজট দেখা দিয়েছে। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক। ড. এম শামসুল হক মনে করেন, ঢাকা কখনও যানজটমুক্ত শহর হবে না।

তিনি বলেন, ‘যানজট কমানোর জন্য অনেক দাওয়াই আছে। আমরা শুধু অবকাঠামো উন্নয়নের দাওয়াইটাই দিয়েছি। কিন্তু পৃধিবীতে যে টেকসই দাওয়াইগুলো পরীক্ষিত সেগুলো আমরা অ্যাপ্লাই করিনি। বসবাসযোগ্য শহর গড়তে হলে গণপরিবহন হওয়া উচিত মেরুদণ্ড। ফুটপাত হতে হবে পথচারীবান্ধব। প্রায় ২০ শতাংশ লোক হেঁটেই গন্তব্যে যান। দূরে যেতে চাইলে মোটরবাইকে যান। আরও দূরে যেতে হলে গণপরিবহনই ভরসা তাদের। আমাদের গরীব লোকের বাহন হয়ে গেছে এটি। অথচ বিদেশে সব ধরনের মানুষ বাসে যাতায়াত করেন।’

এ সময় তিনি ছোট গাড়িগুলোকে রাস্তায় নামার ক্ষেত্রে সরকারের উদাসীনতাকে দায়ী করেন। শামসুল হক বলেন, ‘বিলিয়ন ডলার খরচ করে ফ্লাইওভার বা বিকল্প রাস্তা তৈরি করলে ছোট গাড়িগুলো আরও উৎসাহিত হয়। যানজট নিরসনে প্রাইভেটকারসহ ছোট গাড়িগুলোকে গণহারে নিবন্ধন দেওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে। একটি দোতলা বাসে এক শ’ যাত্রী নেওয়া আর এক শ’টি প্রাইভেটকার কিংবা মোটরসাইকেল থাকা আকাশা-পাতাল পার্থক্য। রাস্তায় শৃঙ্খলা ফেরাতে সরকারকে সবথেকে বেশি উদ্যোগী হতে হবে। ছোট গাড়িকে রেজিস্ট্রেশন না দিলে রাস্তা ফাঁকা হয়ে যায়। ফুটপাত যদি দখলমুক্ত করা যায়, তাহলে মানুষ হেঁটেই গন্তব্যে পৌঁছাতে পারবেন।’

যানজট রোধে ঢাকায় একাধিক ফ্লাইওভার নির্মিত হলেও তা কাজে আসছে না। সেখানেও থেমে থাকে গাড়ির চাকা। স্থাপতি ইকবাল হাবিবও মনে করেন, এ ধরনের ফ্লাইওভার কোনও কাজে আসছে না। তিনি বলেন, ‘সাধারণত মেগাসিটিগুলোতে ফ্লাইওভার প্রকল্প যানজট নিরসনে ভূমিকা পালন করে। কিন্তু আমাদের দেশে প্রেক্ষাপট ভিন্ন। ঢাকায় ফ্লাইওভার নির্মাণ করেও যানজট নিয়ন্ত্রণ করে আসছে না। মাস্টারপ্ল্যান অনুযায়ী কিছু হয়নি বলেই সমস্যা সমাধান হয়নি।’

ইকবাল হাবিব জানান, মেট্রোরেলের কাজ শেষ হলে হয়ত যানজট কিছুটা দূর হতে পারে। অপরিকল্পিত নগর গড়ে ওঠায় শতভাগ যানজট দূরীকরণ হওয়ার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে।

শেষের আগে চলুন বখতিয়ার সাহেবের খোঁজ নিয়ে আসি। আধঘণ্টা ধরে বিজয় সরণির সিগন্যালে বসে আছেন তিনি। দশটা বাজতে মাত্র ৩০ মিনিট বাকি। এরমধ্যেই অফিসে পৌঁছাতে হবে তার। বাধ্য হয়ে বাস থেকে নামলেন। গৃহত্যাগী সূর্যটা মাথার ওপর নিয়ে হাঁটতে শুরু করলেন। গন্তব্য শুলশান-১। দরদর করে ঝরছে ঘাম। মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে, তিন দিন দেরি হলেই কাটা যাবে একদিনের বেতন।