টিসিবির লাইন আর কোটিপতির তালিকা- দুটোই বাড়ছে

একদিকে টিসিবির ট্রাকের পেছনে কম দামে পণ্য কেনার মানুষ বাড়ছে। অর্থাৎ মানুষ গরিব হওয়ার কারণে টিসিবির লাইন বড় হচ্ছে। অন্যদিকে ব্যাংকগুলোতে কোটিপতি আমানতকারীর সংখ্যাও বেড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত এক বছরে ব্যাংকিং খাতে কোটি টাকার বেশি আমানত রাখা হিসাবের সংখ্যা বেড়েছে ৮০৮৬টি। এখন ব্যাংকিং খাতে কোটি টাকার বেশি আমানতকারী হিসাবের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে এক লাখ ১ হাজার ৯৭৬টি।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী এসব জানা গেছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী দেখা যায়, গত ২০২০ সালের ডিসেম্বর শেষে ব্যাংকিং খাতে মোট কোটিপতি অ্যাকাউন্টের (হিসাব) সংখ্যা ছিল ৯৩ হাজার ৮৯০টি। সে হিসেবে এক বছরের ব্যবধানে কোটিপতি হিসাবধারী বেড়েছে ৮০৮৬টি। অবশ্য গত তিন মাসে কোটিপতি আমানতকারী বেড়েছে এক হাজার ৭৩৭ জন। গত বছরের সেপ্টেম্বর শেষে ব্যাংকে কোটি টাকার বেশি আমানত রেখেছেন এমন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নামে খোলা হিসাবের সংখ্যা ছিল এক লাখ ২৩৯টি। আর গত জুন শেষে কোটিপতি আমানতকারীর সংখ্যা ছিল ৯৯ হাজার ৯১৮ জন।

কোটিপতির প্রকৃত সংখ্যা নেই

দেশে এখন কোটিপতির প্রকৃত সংখ্যা কত, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনও পরিসংখ্যান নেই। তবে ২০১৮ সালে সম্পদশালী বৃদ্ধির হার এবং ২০২৩ সাল পর্যন্ত প্রক্ষেপণ ধরে ওয়েলথ-এক্স এর প্রতিবেদনে বলা ছিল, ৩ কোটি ডলার বা আড়াই শ’ কোটি টাকার বেশি সম্পদের মালিকদের সংখ্যা বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি হারে বাড়ছে। ওয়েলথ-এক্সের হিসাবে, ২০১৭ সাল পর্যন্ত পাঁচ বছরে বাংলাদেশে অতিধনীর সংখ্যা বেড়েছে গড়ে ১৭ শতাংশ হারে। এ হার যুক্তরাষ্ট্র, চীন, জাপান, ভারতসহ মোট ৭৫টি বড় অর্থনীতির দেশের চেয়ে বেশি।

অর্থনীতিবিদরা অবশ্য বলছেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের এই পরিসংখ্যান কোটিপতির প্রকৃত সংখ্যা নির্ণয় করে না। তারা বলছেন, বাস্তবে নতুন কোটিপতি বেড়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যানের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি। এই বৃদ্ধিকে সমাজে আয়বৈষম্যের সুস্পষ্ট ইঙ্গিত বলে মনে করেন তারা।

এ প্রসঙ্গে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ড. এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, কোটিপতির সংখ্যা বাড়লেও গরিবের সংখ্যা বেড়েছে। অর্থাৎ সমাজে আয়বৈষম্য লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

এদিকে, বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির তথ্য অনুযায়ী করোনায় নতুন করে দরিদ্র হয়েছে ৬ কোটি ৮০ লাখ মানুষ। করোনার আগে দেশে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর সংখ্যা ছিল ৩ কোটি ৪০ লাখ। গত বছরের ২৬ মার্চ থেকে ৩১ মে পর্যন্ত ৬৬ দিনের টানা বিধিনিষেধের সময় দরিদ্র মানুষের সংখ্যা বেড়ে ৬ কোটি ৮০ লাখে ঠেকেছে। অর্থাৎ করোনার কারণে ৩ কোটি ৪০ লাখ মানুষ নতুন করে দরিদ্র হয়েছে।

এদিকে সরকারি সংস্থা বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) করোনাকালীন আয়, ব্যয় ও বেকারত্বের প্রভাব তুলে ধরে একটি পরিসংখ্যান দিয়েছিল, যেখানে বলা ছিল—করোনায় মানুষের আয় কমেছে ২০ শতাংশ।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত ২০২০ সালের মার্চে যখন দেশে কোভিডের প্রভাব শুরু হয়। তখন ব্যাংকে কোটি টাকার বেশি আমানত রাখা ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের অ্যাকাউন্টের সংখ্যা ছিল ৮২ হাজার ৬২৫টি। এক বছর পর ২০২১ সালের সেপ্টেম্বরেই এক লাখ ছাড়ায় কোটিপতি হিসাবধারী।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, নিয়মিত কোটিপতির সংখ্যা বেড়েছে এটা করোনা মহামারিকালের জন্য আশ্চর্যের বিষয়, তার মানে দেশে বৈষম্য বেড়েছে। তবে এখন কোভিড পরিস্থিতি অনেকটা স্বাভাবিক। অনেকে ব্যবসা-বাণিজ্য করছে। এর ফলে নতুন করে কিছু লোক কোটিপতি হচ্ছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালের ডিসেম্বর শেষে ১২ কোটি ৪৮ লাখ ৯৬ হাজার ৯৩৪টি অ্যাকাউন্টে মোট টাকার পরিমাণ হলো- ১৫ লাখ ১২ হাজার ৪৭২ কোটি টাকা। এর মধ্যে কোটিপতি অ্যাকাউন্টে মোট টাকা হলো—৬ লাখ ৫৩ হাজার ৮৫৮ কোটি টাকা।

২০২০ সালের ডিসেম্বর শেষে কোটিপতি ব্যাংক হিসাবগুলোতে জমা ছিল ৫ লাখ ৯৫ হাজার ২৮৬ কোটি টাকা। আর মোট আমানতের স্থিতি ছিল ১৩ লাখ ৭৯ হাজার ১৫০ কোটি টাকা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, কোটি টাকার হিসাব মানেই সব ব্যক্তি হিসাব নয়। কারণ ব্যাংকে এক কোটি টাকার বেশি আমানত রাখার তালিকায় ব্যক্তি ছাড়াও বেশকিছু প্রতিষ্ঠানের নামও রয়েছে। অর্থাৎ প্রতিটি প্রাতিষ্ঠানিক অ্যাকাউন্টের পেছনে এক বা একাধিক ব্যক্তি রয়েছেন।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, ব্যাংকে কোটি টাকার বেশি আছে—এমন আমানতের সংখ্যা বেড়ে যাওয়া মানেই দেশে নতুন করে কোটিপতির সংখ্যা বেড়ে গেছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য মতে গত ডিসেম্বর শেষে দেখা যায়, ১ কোটি থেকে ৫ কোটি টাকার হিসাবধারীর সংখ্যা হলো ৭৯ হাজার ৮৮৩টি। এই অ্যাকাউন্টে তাদের টাকার পরিমাণ হলো- ১ লাখ ৬৬ হাজার ৪৪৩ কোটি টাকা। এছাড়া পাঁচ কোটি থেকে ২০ কোটি টাকার হিসাবধারীর সংখ্যা হলো ১৭০০৯ জন। তাদের অ্যাকাউন্টে মোট টাকার পরিমাণ হলো- ১ লাখ ৫৮ হাজার ৬৯৫ কোটি টাকা। একইসঙ্গে বিশ কোটি থেকে ৫০ কোটির উপরে মোট হিসাবধারীর সংখ্যা হলো ৫০৮৪টি। এই হিসাবগুলোতে টাকার পরিমাণ হলো- ৩ লাখ ২৮ হাজার ৭১৯ কোটি টাকা।

এদিকে এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ১৯৭২ সালে দেশে কোটিপতি ছিলেন মাত্র পাঁচ জন। ১৯৭৫ সালের ডিসেম্বরে এই সংখ্যা বেড়ে ৪৭ জনে দাঁড়ায়। ১৯৮০ সালে এ সংখ্যা দাঁড়ায় ৯৮ জনে। এরশাদ সরকারের পতনের সময় ১৯৯০ সালের ডিসেম্বরে কোটিপতির সংখ্যা ছিল ৯৪৩ জন। ১৯৯৬ সালের জুনে কোটিপতি ছিলেন দুই হাজার ৫৯৪ জন। ২০০১ সালের সেপ্টেম্বর শেষে এ সংখ্যা দাঁড়ায় পাঁচ হাজার ১৬২ জনে। ২০০৬ সালের ডিসেম্বরে কোটিপতির সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৮ হাজার ৮৮৭ জনে। ২০০৮ সালে ব্যাংক খাতে কোটিপতি আমানতকারী গ্রাহক ছিলেন ১৯ হাজার ১৬৩ জন।