খোলা জায়গায় প্রস্রাবে বিব্রত রাজধানীবাসী, বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি

রাজধানীর পরীবাগ পথচারী সেতুর নিচে দিয়ে হাঁটতে গেলেই নাকে আসে প্রস্রাবের উৎকট গন্ধ। প্রতিদিন শত শত মানুষের প্রস্রাবে স্যাঁতস্যাঁতে হয়ে আছে জায়গাটি। কিছুক্ষণ দাঁড়াতেই দেখা গেল রিকশা চালকরা এক এক করে এসে প্রকৃতির কর্ম সারছেন। একই চিত্র সড়কের বিপরীত পাশেও। মুখে মাস্ক থাকা সত্ত্বেও প্রস্রাবের উৎকট গন্ধে সেখানে টেকা দায়। শুধু পরীবাগ নয়, এমন চিত্র রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার।

ব্যস্ত নগরী ঢাকাতে কাজের প্রয়োজনে আসা মানুষের মধ্যে একটি বড় অংশ রিকশাচালক। তারা দিনভর সড়কে ঘুরে বেড়ান। প্রকৃতির ডাকে কখনও সাড়া দেওয়ার প্রয়োজন হলে আয়ের বাহনটি রেখে তারা কোথাও যেতে চান না। ফলে প্রস্রাবের জন্য তারা বেছে নেন ফুটপাত, খোলা জায়গা ও রাস্তার পাশের দেয়াল।

সড়কের পাশে এভাবে প্রস্রাব করায় বিপত্তি পোহাতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। যত্রতত্র প্রস্রাব করায় পরিবেশের পাশাপাশি মানুষের মধ্যে রোগব্যাধির প্রকোপও বাড়ছে বলে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা জানান।

ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের তথ্য অনুযায়ী, পুরো রাজধানীতে লাইসেন্সধারী রিকশা ও রিকশাভ্যানের সংখ্যা প্রায় ৮০ হাজার। রাজধানীতে থাকা রিকশা চালকদের সুনির্দিষ্ট হিসাব নেই। তবে শ্রমিক অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠন বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজ ২০১৯ সালে তাদের একটি গবেষণা প্রতিবেদনে জানায়, রাজধানীতে আনুমানিক ১১ লাখ রিকশা আছে। এই ১১ লাখ রিকশা চালান অন্তত ছয় লাখ চালক। তাদের প্রস্রাবের কোনো সুনির্দিষ্ট জায়গা নেই।

নগরবাসীর অভিযোগ, ঢাকার রাস্তায় চলতে গেলে প্রায়ই নাকে আসে প্রস্রাবের উৎকট গন্ধ। ফুটপাত দিয়ে হাঁটতে গেলে মাস্ক পরার পরও হাত দিয়ে নাক চেপে চলতে হয়।

ঢাকাকে মসজিদের শহর বলা হয়। এই শহরের মসজিদের অভাব নেই। আবার এমন কোনো মসজিদ নেই, যেখানে টয়লেট নেই। তবুও মানুষ রাস্তার পাশে প্রস্রাব করে। বিশেষ করে রিকশা চালকরা।’
এলাহী বক্স, পথচারী
পরীবাগ ও হাতিরপুলসহ বেশ কয়েকটি এলাকা ঘুরে দেখা যায়, ফুটপাতের যে স্থানে প্রস্রাব করা হচ্ছে সেই স্থান ও পার্শ্ববর্তী এলাকা দূষিত হচ্ছে। সড়কের ওই স্থানটিও দ্রুত নষ্ট হচ্ছে। পাশাপাশি আশপাশে কোনো গাছপালা থাকলে সেগুলোরও ক্ষতি হচ্ছে। এছাড়া যেসব পথচারী ফুটপাত ধরে চলাচল করতো তারা এখন ফুটপাত ছেড়ে রাস্তার মাঝপথ দিয়ে চলাচল করায় সড়কে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ছে। এছাড়া বিভিন্ন রোগের ঝুঁকির বিষয়টি তো আছেই।

হাতিরপুল এলাকায় পথচারী মো. এলাহী বক্সের সঙ্গে কথা হয় । তিনি জানান, রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে দেয়ালে দেয়ালে লেখা আছে- এখানে প্রস্রাব করা নিষেধ। তবুও এর তোয়াক্কা করছে না কিছু মানুষ।

এলাহী বক্স বলেন, ‘বিষয়টি খুবই অসহ্যকর। ঢাকাকে মসজিদের শহর বলা হয়। এই শহরের মসজিদের অভাব নেই। আবার এমন কোনো মসজিদ নেই, যেখানে টয়লেট নেই। তবুও মানুষ রাস্তার পাশে প্রস্রাব করে। বিশেষ করে রিকশা চালকরা।’একইভাবে অভিযোগ করেছেন মগবাজার এলাকার বাসিন্দা শরিফুল ইসলামও। তিনি বলেন, ‘রাস্তার পাশে প্রস্রাব করাটা যেমন অশোভন, একইভাবে অস্বাস্থ্যকর। এ বিষয়ে আমরা খুব একটা নজর দিচ্ছি না। কিন্তু বিষয়টি দিন দিন বোধ হয় বেড়ে চলেছে।’

বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে চাইলে রিকশা চালকদের অনেকেই অনাগ্রহ প্রকাশ করেন। তবে কিছু রিকশা চালকদের দাবি, চলতি পথে রাস্তায় প্রস্রাব করা ছাড়া তাদের করার কিছু নেই।

মসজিদের শৌচাগার বা পাবলিক টয়লেট ব্যবহারের বিষয়ে জানতে চাইলে রিকশা চুরি যাওয়ার ভয়ের কথা জানান তারা।

dhaka-2বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সাবেক উপাচার্য ভাইরোলজিস্ট ডা. নজরুল ইসলাম জানান, মোট রিকশা চালকদের অন্তত ৫ শতাংশ প্রস্রাব সংক্রান্ত সংক্রমণে ভোগেন। তাদের মাধ্যমে ছড়াতে পারে সর্দি-কাশি, ডায়েরিয়া থেকে শুরু করে নিউমোনিয়া। আর দীর্ঘদিনের প্রস্রাব সংক্রমণে বাড়তে পারে লিভার ও কিডনির নানা রোগ।

এই চিকিৎসক আরও বলেন, ‘এই বিশালসংখ্যক জনগোষ্ঠীর প্রস্রাবে ইনফেকশন নেই, এটা হতে পারে না। তাদের অন্তত ৫ শতাংশের যদি ইনফেকটেড প্রস্রাব রাস্তার পাশে করা হয়, তাহলে সমস্যা আছে। ইউরিনের কিছু উপাদন বাতাসে উড়ে। পরে তা খাবারে পড়তে পারে, নিঃশ্বাসের সঙ্গে ফুসফুসে যেতে পারে।’

ডা. নজরুল আরও বলেন, ‘এটা যদি লোকের খাদ্যের মধ্যে চলে যায়, তাহলে ডায়েরিয়া হতে পারে। আর যদি ফুসফুসে যায়, তাহলে ফুসফুস সংক্রমণ, সর্দি-কাশি, নিউমোনিয়া হতে পারে।’