একুশ পালনে ভারত থেকে বাংলাদেশে তারা

‘ভাষাশহীদদের প্রতি এ দেশের মানুষের এত ভালোবাসা ও আবেগ, তা নিজ চোখে না দেখলে বিশ্বাস হত না। কবি অতুল প্রসাদ সেন যেমন বলেছেন, মোদের গরব মোদের আশা—আ-মরি বাংলা ভাষা, মাগো তোমার কোলে, তোমার বোলে কতই শান্তি ভালবাসা। তাই তো একুশ উদযাপনে এ দেশে ছুটে আসা। এর আগেও একবার এসেছিলাম একুশ পালনে। সেই স্মৃতি স্মরণ করে এ বছর আবারও এসেছি। আমি সত্যিই অভিভূত।’

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে ঢাকা কলেজের শহীদ মিনারে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানানোর পর এভাবেই অভিব্যক্তি জানাচ্ছিলেন ভারতের বারাসাতের হিঙ্গলগঞ্জ মহাবিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ ও নজরুল চর্চা কেন্দ্রের সভাপতি ড. শেখ কামাল উদ্দিন।

শুধু তিনিই নন, শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে তার সঙ্গে ভারত থেকে বাংলাদেশে এসেছেন পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের চব্বিশ পরগনা জেলার হালিশহর হাই স্কুলের শিক্ষক মো. মিনহাজ হোসেন, আলাপিনী ক্যায়ার সংগীত প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের অধ্যক্ষ অধ্যাপক দেবযানী ভট্টাচার্য ও বাচিক শিল্পী স্বপন ভট্টাচার্য।

সোমবার রাজধানীর ঢাকা কলেজ শহীদ মিনার ও কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার পরিদর্শনের পর ভাষাশহীদদের প্রতি এদেশের মানুষের শ্রদ্ধাবোধ আর ভালোবাসা দেখে বিস্ময় প্রকাশ করেন তারা। বাচিক শিল্পী স্বপন ভট্টাচার্য বলেন, ‘মানুষের ভাষা মুছে দেওয়ার মতো শক্তি কারো নেই। আমরা ছোট সময় থেকেই জেনেছি, মাতৃভাষা রক্ষা করতে গিয়ে জীবন দিয়ে একটি জাতিসত্তা গড়ে উঠেছে। সেই জাতিসত্তার মানুষদের চোখের সামনে দেখতে পেয়ে খুব ভালো লাগছে।’

তিনি বলেন, ‘এই কলেজ প্রাঙ্গণে শহীদ মিনারে ছাত্র-শিক্ষকদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ আমাদের অনুপ্রাণিত করেছে। আমি এই প্রথম বাংলাদেশে এলাম। শহীদদের শ্রদ্ধা নিবেদনের যে দৃশ্য আমরা দেখলাম এটি জীবনের পাথেয় হয়ে রইল। আমি চেষ্টা করব প্রতি বছর একুশে ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশে আসার জন্য।’

বাংলা ভাষায় কথা বললেও এই ভাষা রক্ষায় যারা জীবন দিয়েছিলেন, তাদের স্মরণে এমন কোনো অনুষ্ঠানে এই প্রথম উপস্থিত হয়েছেন জানিয়ে আলাপিনী ক্যায়ার সংগীত প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের অধ্যক্ষ অধ্যাপক দেবযানী ভট্টাচার্য বলেন, ‘বয়স হওয়ার পর থেকেই শুনেছি বাঙালির এই ত্যাগ-তিতিক্ষার কথা। তবে জীবনের প্রথম এমন কোনো অনুষ্ঠানে অংশ নিলাম। অনেক প্রতিবন্ধকতা পেরিয়েই আজকের এ অনুষ্ঠানে এসেছি। শুধু মাত্র অদম্য উৎসাহ আর মনোবল নিয়েই ওপার বাংলা থেকে ছুটে এসেছি।’

তিনি বলেন, ‘যদি আমার পরিচিত জন অথবা যত বাঙালি আমার ওখানে রয়েছেন, তাদের এখানে এনে একুশ উদযাপনের এ দৃশ্য দেখাতে পারতাম, তবে আমার সাধ পূর্ণ হতো। সবার মাঝেই কত স্বতঃস্ফূর্ততা। আমরাও ওখানে শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করি। তবে এখানকার এত সুন্দর আবেগ উচ্ছ্বাস খুঁজে পাই না।’

চব্বিশ পরগনা জেলার হালিশহর হাই স্কুলের শিক্ষক মো. মিনহাজ হোসেন বলেন, ‘নিজে সরাসরি উপস্থিত থেকে ভাষাশহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করতে পেরে অনেক ভালো লাগছে। প্রাচীন এ বিদ্যাপীঠের প্রাচীন অঙ্গনে দাঁড়িয়ে সত্যিই অভিভূত। মানুষজন রাত জেগে এতটা আবেগ আর ভালোবাসা নিয়ে এখানে উপস্থিত হয়েছে, না দেখলে বিশ্বাস করতে পারতাম না।’