যে তিনভাবে শেষ হতে পারে রাশিয়ার এই যুদ্ধ

ইউক্রেনে যে যুদ্ধটা চলছে সেটা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপে সংঘটিত সবচেয়ে শক্তিশালী ঘটনা। আর কিউবার মিসাইল সংকটের পর এ ঘটনাতেই সবচেয়ে বড় সংকটের মুখে পড়ল পৃথিবী।

হামলা-পাল্টা হামলা দিয়ে গেল কয়েকদিনে যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে তিনরকম ঘটনাক্রমের মধ্যে দিয়ে তার সমাপ্তি আসতে পারে। এর একটি হলো- ধ্বংসযজ্ঞ। দ্বিতীয়টি নোংরা সমঝোতা আর তৃতীয়টি হলো পরিত্রাণ।

সম্পূর্ণ বিপর্যয়কর বা ধংসযজ্ঞের যে পরিস্থিতির কথা চিন্তা করা হচ্ছে তা ইতোমধ্যে চলমান। এ অবস্থা চলতে থাকবে যতদিন না ভ্লাদিমির পুতিনের ইচ্ছার কোনো পরিবর্তন হয় অথবা পশ্চিমারা তাকে নিবৃত্ত করে। এখনও পর্যন্ত পুতিনকে দেখে মনে হচ্ছে স্বাধীন সার্বভৌম দেশ হিসেবে মানচিত্র থেকে ইউক্রেনের নামগন্ধ মুছে ফেলতে যত রক্ত ঝরানো লাগে পুতিন ঝরাবেন। যত ধ্বংস করা লাগবে তিনি করবেন।

আর এ ধরনের পরিস্থিতি হলে নাৎসিরা যে ধরনের যুদ্ধাপরাধ করেছিল পুতিনও হয়তো সে ধরনের যুদ্ধাপরাধ করে বসবেন। আর তেমনটা হলে ভ্লাদিমির পুতিন, তার মিত্রদেশ ও গোটা রাশিয়া একেবারেই একঘরে হয়ে যাবে।

পুতিন হলেন এমন একজন রাষ্ট্রনায়ক যার রাষ্ট্র এতটাই বিশাল যে সেখানে ১১টা টাইম জোন রয়েছে। পুতিন এমন একজন রাষ্ট্রনায়ক যার দেশ বিশ্বের সর্ববৃহৎ তেল ও গ্যাস উৎপাদনকারী। পুতিন এমন একজন রাষ্ট্রনায়ক যার হাতে রয়েছে পরমাণু বোমার বিশাল ভান্ডার। এমন বিরাট ক্ষমতাধর কোনো রাষ্ট্রনায়ককে এর আগে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ নিয়ে মুখোমুখি দাঁড়াতে দেখেনি বিশ্ব।

পুতিন যতবারই তার চালাতে থাকা আগ্রাসন থামাতে অস্বীকৃতি জানাচ্ছেন, পরিস্থিতি ততই খারাপের দিকে যাচ্ছে। প্রতিটা টিকটিক ভিডিও বা মোবাইল ফোনে ধারণ করা ভিডিওগুলো থেকে পুতিনের নিষ্ঠুরতার যত প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে, বিশ্বের জন্য নীরব থাকা তত কঠিন হয়ে যাচ্ছে। আর এর ফলে ইউরোপের একেবারে কেন্দ্রে পরমাণু অস্ত্র ব্যবহারের ঝুঁকি বাড়ছে। এর আগে এই একই সূত্রে, হাজারো মৃত্যুর বিনিময়ে আলেপ্পো এবং গ্রোঞ্জি দখল করেছেন পুতিন। এবারও যদি তাকে থামানো না যায় তবে ইউরোপীয় আফগানিস্তান তৈরি করবেন তিনি।

ইউক্রেনে কোনো পুতুল সরকার বসিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা নেই ভ্লাদিমির পুতিনের। ইউক্রেনে কোনো পুতুল সরকার বসানো হলে তাকে নিয়মিত বিদ্রোহীদের মোকাবিলা করতে হবে। এর অর্থ হলো সেখানে নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে হলে হাজার হাজার রুশ সেনাকে দীর্ঘ মেয়াদে বা চিরস্থায়ীভাবে ইউক্রেনে মোতায়েন থাকতে হবে। আবার তাদেরও প্রতিদিন ইউক্রেনীয়দের হামলার মুখে পড়তে হবে। কিভাবে এ যুদ্ধের শেষ হবে পুতিন আদৌ তা চিন্তা করেছেন কি?

মন্দের ভালো হতে পারতো এই যে পুতিনের চাওয়া স্রেফ এটুকু যে- তিনি ইউক্রেনকে ন্যাটোর বাইরে রাখবেন। কিন্তু অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে বাসনায় এর থেকে অনেক বেশি দূর এগিয়েছেন পুতিন। পুতিন আসলে একরকমের কল্পনার ভেতরে রয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম রুশ বিশেষজ্ঞ ফিওনা হিল পলিটিকোকে দেওয়া একটি সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ‘রাসকি মির’ বা ‘রুশ পৃথিবী’ বলে একটা কথা আছে। এতে বলা ইউক্রেনীয় আর রুশরা আসলে একই। বলা হয়, রুশ ভাষাভাষী সব মানুষকে আবার একত্রিত করার মিশনে রয়েছেন ভ্লাদিমির পুতিন।
যুক্তরাষ্ট্র ও মিত্ররা যদি তার পথের কাঁটা হয় তবে তিনি কতটা ভয়ঙ্কর হবেন তার একটা ইঙ্গিত তিনি দিচ্ছেন। তিনি আসলে ইঙ্গিত দিচ্ছেন যে তার পথের কাঁটা কেউ হলে তাকে এত কঠিন ফল ভোগ করতে হবে যা আগে কেউ দেখেনি।

যুদ্ধ সমাপ্তির দ্বিতীয় দৃশ্যপটটা হতে পারে এমন যে- যে কোনোভাবেই হোক শেষ পর্যন্ত ইউক্রেনের সেনাবাহিনী ও সেখানকার মানুষরা একটা লম্বা সময় রুশ সেনাদের বিরুদ্ধে লড়ে গেল। আর রাশিয়ার ওপর অর্থনৈতিক যে নিষেধাজ্ঞা পশ্চিমারা আরোপ করেছে দেশটি তার ফল ভোগ করতে শুরু করল। ফলে এমন একটা পরিস্থিতির তৈরি হলো যেখানে দু’পক্ষই একটা সমঝোতায় আসতে চাইবে। এক্ষেত্রে ইউক্রেনকে হয়তো এমন শর্তের মুখে পড়তে হতে পারে যে- যুদ্ধবিরতি ও ইউক্রেন থেকে রুশ সেনা প্রত্যাহারের বদলে, ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চল যা এখনও প্রকৃতপক্ষে রাশিয়া নিয়ন্ত্রণ করে, তা আনুষ্ঠানিকভাবে রাশিয়ার অংশ হবে। আবার ইউক্রেন ন্যাটোতে যাবে না বলেও প্রতিশ্রুতি দেবে। একইসময়ে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা রাশিয়ার ওপর আরোপিত সকল নিষেধাজ্ঞা তুলে নেবে।

তবে এমনটা হওয়ার সম্ভাবনা তুলনামূলক কম। কারণ এটা হলে প্রমাণ হয়ে যাবে- অর্থনীতি বিরাট ক্ষতি ও বহু রুশ সেনার মৃত্যুর বিনিময়ে ইউক্রেনকে গিলে ফেলার যে স্বপ্ন পুতিন দেখেছিলেন তা তিনি পূরণ করতে পারলেন না। পাশাপাশি ইউক্রেনকেও তার একটা অংশ ছেড়ে দিতে হবে আর মেনে নিতে হবে যে, রাশিয়া ও ইউরোপের মাঝামাঝি ‘নো ম্যানস ল্যান্ডে’ পরিণত হবে ইউক্রেন, নামে মাত্র তার স্বাধীনতা অবশ্য থাকবে। পুতিনের হাতে ইউক্রেনকে একা ছেড়ে দেওয়ার যে শিক্ষা পাওয়া গেল, সেটাও বিশ্বকে ভুলে যেতে হবে।

এছাড়া আর যেভাবে যুদ্ধের একটা সমাপ্তি আসতে পারে তা হলো- রুশ আগ্রাসন শুরুর পর যে বীরত্ব নিয়ে ইউক্রেনের মানুষ লড়েছে, সেই পরিমাণ শক্তি ও সাহস নিয়ে প্রতিবাদের মিছিলে সামিল হবেন রুশরা। রাশিয়াতেই পুতিনবিরোধী ক্ষোভ-বিদ্রোহ এমন অবস্থায় পৌঁছাবে যে শেষ পর্যন্ত টিকতে পারবে না তিনি।

রাশিয়ার বহু মানুষই এতদিনে বুঝে গেছেন যে পুতিনের হাতে যতদিন রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা আছে, স্বাধীনতার মুখ তারা দেখতে পারবেন না। পুতিনের উন্মত্ততার বিরুদ্ধে এরইমধ্যে প্রতিবাদ শুরু হয়েছে। নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়েই তারা এসব প্রতিবাদে সামিল হচ্ছেন। কে জানে, এর মধ্যে দিয়েই হয়তো রাশিয়ায় ‘পুতিন-জুজুর’ ভয় কাটবে, শুরু হবে তীব্র এক গণআন্দোলন, যাতে পতন হবে প্রচণ্ড ক্ষমতাধর এই ভ্লাদিমির পুতিনের।

সব কিছুর পরও সব কিছু বুঝেও যে রুশরা কোনো কথা বলছেন না তাদের জীবনেও নানাভাবে প্রভাব পড়ছে। যেমনটা জানা যাচ্ছে : সুইজারল্যান্ডে একটি মিউজিক ফেস্টিভ্যালে দুটি কনসার্ট বাতিল করা হয়েছে, কারণ তাতে রুশ একজন মিউজিশিয়ানের থাকার কথা ছিল। অস্ট্রেলিয়ার জাতীয় সাঁতার দল জানিয়ে দিয়েছে তারা রাশিয়াতে সাঁতারের ওয়ার্ল্ড চ্যাম্পিয়নশিপ বয়কট করবে। যুক্তরাষ্ট্রে একটি মদের দোকানের মালিক তার দোকানে থাকা রুশ মদ ড্রেনে ফেলে দিয়েছেন। সংস্কৃতি থেকে অর্থনীতি, খেলাধুলা থেকে ভ্রমণ, প্রতিটা অঙ্গন থেকেই অসংখ্য উপায়ে প্রতিবাদ আসছে। ভ্লাদিমির পুতিনের আগ্রাসী চেতনার বিরুদ্ধে সোচ্চার হচ্ছে কণ্ঠগুলো।

আর এখন তো এসবের সঙ্গে নতুন করে যুক্ত হচ্ছে ‘পুতিন ট্যাক্স;’ মানে পশ্চিমারা রাশিয়ার ওপর যে নিষেধাজ্ঞা দিল তার ভার বইতে হবে রাশিয়ার সাধারণ মানুষদেরই। আতঙ্কের কারণে পুঁজিবাজারে দরপতন ঠেকাতে সোমবার শেষ পর্যন্ত এ বাজার বন্ধ রাখতে বাধ্য হয় রুশ কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এরসঙ্গে রুবলের দরপতন তো রয়েছেই।

পুতিন ঘনিষ্ট রাশিয়ার জ্যেষ্ঠ গোয়েন্দা ও ঊর্ধ্বতন সামরিক কর্মকর্তারা হয়তো ক্রেমলিনে গোপনে কোথাও বৈঠকে বসছেন আর বলছেন, হয় মহামারিতে বিচ্ছিন্ন থাকার সময়টাতে কৌশলে কোথাও কোনো একটা ভুল করে ফেলেছেন পুতিন অথবা তিনি আসলে অস্বীকার করছেন যে ইউক্রেন, যুক্তরাষ্ট্র ও এর মিত্রদের ক্ষমতা কতটা তা তিনি বুঝে উঠতে পারেননি।

ইউক্রেনে যা চলছে তা যদি চালাতেই থাকে পুতিনবাহিনী তবে তিনি ও তার পক্ষের লোকেরা আর হয়তো কখনও লন্ডনের মুখ দেখতে পারবেন না। গোপনে নিউ ইয়র্কে যেসব ফ্ল্যাট তারা কিনে রেখেছেন সেগুলোরও হয়তো আর মুখ দেখা সম্ভব হবে না। তারা আসলে রাশিয়া নামের বিরাট একটা কারাগারে আটকা পড়বে। তাদের স্বাধীনতা থাকবে কেবল সিরিয়া, ক্রিমিয়া, বেলারুশ, আর উত্তর কোরিয়া ভ্রমণের। এরসঙ্গে হয়তো চীনে ভ্রমণেরও সুযোগও পাবেন রুশরা। সুইজারল্যান্ড থেকে অক্সফোর্ড সবখানেই তাদের সন্তানদের লেখাপড়ার পথ বন্ধ হয়ে যাবে।

তাদের সামনে দুটি রাস্তা। হয় তারা পুতিনের পতনের পথ সামিল হবেন নয়তো পুতিনের সঙ্গে একইঘরে একঘরে থাকবেন। সেটা হয়তো কেউ চাইবেন না।