আনন্দ ও শোকের মাস, মুসলিম বিশ্বের চেয়ে ভিন্ন রীতি

পবিত্র মাস রমজান। মুসলিমদের কাছে আল্লাহর নৈকট্য লাভের জন্য বছরের সবচেয়ে সেরা সময় এটি। প্রতিটি দেশেই রমজান মাস নিয়ে মুসলিমদের মধ্যে রয়েছে আলাদা সংস্কৃতি। তবে সবার উদ্দেশ্য এক তা হলো- আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন ও পবিত্র মাসের তাৎপর্য মেনে চলা। শিয়া মুসলিমের দেশ ইরান। দেশটিতে বিভিন্ন আয়োজনের মাধ্যমে পালিত হয় মাহে রমজান।

আনন্দের সঙ্গে নিয়ে আসে শোক
রমজান আল্লাহর রহমত নিয়ে আসে। এ নিয়ে আলাদা আলাদা আয়োজন করে ইরানিরা। উৎসবের আমেজ থাকলেও তা হয় অনেকটা নীরবে। রমজান মাসের মাঝামাঝি সেই আনন্দ রূপ নেই শোকে। কারণ এই মাসেই শহীদ হয়েছিলেন হজরত আলী (রা.)। ১৯ রমজানে তিনি ছুরিকাঘাতে আহত হয়েছিলেন। এ ঘটনার দু’দিন পর ২১ রমজান তিনি শাহাদাতবরণ করেন। এই স্মৃতিকে ধরে রাখার জন্য নানা আয়োজনের মাধ্যমে তিন দিন শোক পালন করেন ইরানিরা। কেউ কেউ প্রকাশ্যেও শোক কর্মসূচি পালন করে থাকেন।

বন্ধ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, চলে ভিন্ন রকমের শিক্ষাদান
ইরানি আলেম এবং মাদ্রাসার ছাত্ররা তাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রেখে পুরো রমজান মাস কোরআন-হাদিস চর্চা, ওয়াজ-নসিহত এবং দিক-নির্দেশনা দানের জন্য সারাদেশের গ্রাম-গঞ্জ ও শহরে ছড়িয়ে পড়েন। যা দেশবাসীকে ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক জ্ঞান-প্রজ্ঞায় আলোকিত করে তুলে। এজন্য তারা জনসাধারণ থেকে অর্থ বা সাহায্য নেন না। বরং গ্রান্ড আয়াতুল্লাহ সাহেবান তাদের পৃষ্ঠপোষকতা করে থাকেন। ইরানে রমজান মাসে প্রায় সবাই কোরআন তেলাওয়াত করেন। এটা তাদের সাধারণ অভ্যাস। আয়োজন করা হয় বড় বড় কোরআন মাহফিলের। সেখানে শুধু কোরআন তেলাওয়াত হয়। আর যারা কোরআন পড়তে জানেন না, তারা এ মাসে কোরআন পড়া শিখে নেন। ছোট ছোট বাচ্চাদের এ মাসে কোরআন শেখানোর জন্য বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়।

মাসব্যাপী মসজিদে অবস্থান
ইরানি শিয়া আলেমদের ফতোয়া অনুসারে বালাদে কবিরা বা বৃহৎ শহর তথা মেগাসিটিতে সতের কিলোমিটারের অধিক সফর করলেই মুসাফির হয়ে যেতে হয়। আর মুসাফিরদের রোজা রাখা জাফরি ফেকাহতে নিষিদ্ধ। এ জন্য মসজিদগুলোতে রমজান মাসে ইতেকাফকারীদের সংখ্যা অনেক বেড়ে যায়। তারা দিনের বেলায় অফিস করেন এবং রাতের বেলায় মসজিদে অবস্থান করেন। ইতেকাফকারীদের খাবার মসজিদ কর্তৃপক্ষই সরবরাহ করে।

হালকা কিন্তু স্বাস্থ্যকর সেহরি
রোজা রাখার জন্য ইরানিরা সেহরিতে হালকা খাবার পছন্দ করেন। এছাড়া বেশি বেশি পানি পান করেন। যাতে রোজার সময় স্বাস্থ্য ঠিক থাকে। সেহরিতে তাদের খাবারে থাকে প্রচুর প্রোটিন এবং পানি। আসলে সাধারণ সময় ইরানিরা দুপুরে যেমন খাবার খান, রমজানে সেহরিতে ঠিক তেমন খাবার খেয়ে থাকেন।

ইফতারে বাহারি খাবার
ইরানের ইফতার সংস্কৃতি অন্যান্য মুসলিম দেশগুলোর মতোই বেশ আকর্ষণীয়। ইফতারে থাকে বাহারি আয়োজন। নানা ধরনের ফলমূল, পানীয় ও মিষ্টান্ন দিয়ে ইফতার করেন ইরানিরা। ইফতারিতে অনেকটা অবশ্যম্ভাবী উপাদান হিসেবে থাকে টমেটো, শসা, লেটুসপাতার সালাদ এবং পুঁদিনা ও ধনিয়া পাতাসহ নানা রকমের সুগন্ধযুক্ত পাতা। থাকে বিশেষ জিলাপি ও হালিম। ফলের মধ্যে থাকে খেজুর, আপেল, চেরি, তরমুজ আখরোট, তলেবি বা এক ধরনের বাঙ্গি, কলা, আঙ্গুর ইত্যাদি। এছাড়া, মধু, রুটি, পনির, দুধ, পানি, চা উল্লেখযোগ্য। ছোট চাল, চিনি আর জাফরান দিয়ে রান্না হয় এক ধরনের ক্ষির বা পায়েশ যার ইরানি নাম ‘শোলে জার্দ’।

ব্যক্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগে ইফতার
বিভিন্ন স্থানে স্থানীয় ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান কতৃপক্ষের উদ্যোগে আয়োজন করা হয় ইফতার। ইরানের মাহশাদে বিশ্বের সবচেয়ে বড় ইফতারের আয়োজন করা হয় বলে দাবি আয়োজকদের। এই ইফতার মাহফিল সফল করার জন্য প্রতিদিন কয়েকশ’ স্বেচ্ছাসেবক কাজ করেন। সূর্যোদয় থেকে ইফতারের আগ পর্যন্ত প্রতিদিন এক লাখ মানুষের জন্য চলে এই আয়োজন। খাবার পরিবেশনের আগে প্রতিদিন বিশেষ মোনাজাত করা হয়। এছাড়া কোমে হযরত মাসুমার এর মাজারেও ইফতার আয়োজন হয় বড় আকারে। মসজিদে কিংবা আত্মীয়-স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশীর বাড়িতে ইফতারি দেয়ার রেওয়াজ ইরানেও আছে। এছাড়া, যেসব অফিস ইফতারের সময়ও খোলা থাকে সেখানে অফিস থেকেই ইফতার সরবরাহ করা হয়।

পণ্যমূল্য স্বাভাবিক
রমজানে বাজারে পণ্য সরবরাহ আর দশটা মাসের মতোই স্বাভাবিক থাকে। খেজুর বা গোশতের দাম সামান্য কিছু বাড়তে পারে। কিন্তু সরকারি বাজারগুলোতে রমজান উপলক্ষে দাম ও মানের দিকটি বিশেষভাবে খেয়াল রাখা হয়। রোজার সময় সাধারণ মানুষের ওপর যাতে বাড়তি চাপ না পড়ে সে দিকটি বিবেচনা করে সরকারের পক্ষ থেকে সরকারি বাজারে পণ্যমূল্যে ভর্তুকি দেয়া হয়। সরকারি বাজার ও পাড়া-মহল্লার দোকানগুলোতে সরকারি- বেসরকারি বিভিন্ন রকমের দুধ, দই ও দুগ্ধজাত পণ্যের প্রচুর সরবরাহ থাকে।

মাশহাদ, রোজাদারদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ গন্তব্য
মাশহাদ ইরানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় শহর এবং ইমাম রেজার পবিত্র মাজার এখানে অবস্থিত। রমজান মাসে অনেক ইরানি এই শহরে যান। লোকেরা ইমাম রেজার পবিত্র মাজারে একসাথে প্রার্থনা করার জন্য জড়ো হন যাতে তাদের ইচ্ছা পূরণ হয়। মাশহাদে অনেক সুস্বাদু খাবার রয়েছে যা এই মাসের জন্য বিশেষভাবে পরিবেশন করা হয়।

ব্যক্তিগত সাজসজ্জা
ইরানিদের ঐতিহ্য, রীতিনীতিতে রমজান একটি ব্যতিক্রমী ভূমিকা পালন করে। ইরানের অনেক লোক তাদের দোকান বা গলি আলো এবং ফুল দিয়ে সাজায়। লোকেরা একে অপরকে ‘রমজান মুবারক’ (বরকতময় রমজান) বলে অভিনন্দন জানান।

আরও সক্রিয় হয়ে ওঠে মসজিদ
পবিত্র রমজান মাসে মসজিদগুলো আরও সক্রিয় হয়ে ওঠে। স্বেচ্ছাসেবকরা যারা দাতব্য কাজ করেন, তারা মানুষকে মসজিদে খাবার এবং ইফতার বিতরণ করেন। প্রার্থনা, কুরআন তেলাওয়াত, ধর্মীয় ব্যক্তিত্বের বয়ানসহ নানা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।

ইফতারি শেষে ইরানে শিয়া মুসলমানদের মধ্যে নেই তারাবির ব্যস্ততা। কারণ শিয়া মাজহাবে তারাবি নামাজের বিশেষ গুরুত্ব নেই।
আন্তর্জাতিক কুদস দিবস
ইসরায়েলি শাসকদের দখলদারিত্ব থেকে ফিলিস্তিনের মুক্তির জন্য এবং ইসরায়েলের নৃশংসতার নিন্দা জানাতে ইরানীরা আন্তর্জাতিক কুদস দিবস পালন করে। রমজানের শেষ শুক্রবারকে আন্তর্জাতিক কুদস দিবস হিসেবে পালন করা হয়। এদিনে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করে ভাষণ দেন। ১৯৭৯ সালে ইরানে ইসলামী বিপ্লবের পর থেকে এই দিবস পালিত হয়ে আসছে।

নীরব ঈদ
৮৫ শতাংশ শিয়া এবং ১৫ শতাংশ সুন্নি মুসলিমের দেশ ইরানে রমজান শেষে ঈদ উদযাপন হয় অনেকটা নীরবে। অনুষ্ঠানের ঘটা থাকে ব্যক্তিগত সব আয়োজনে। ঈদে দান করাকে তারা গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন। বিশেষ করে প্রতিটি মুসলিম পরিবার গরিবদের মধ্যে খাবার বিলিয়ে থাকে। এমনকি ধনী অনেকে ঈদুল ফিতরে গরিবদের মধ্যে মাংস বিতরণ করে।

সূত্র: সার্ফইরান, তেহরান টাইমস, তাসনিম নিউজ