কপিরাইট অফিস নখ-দন্তহীন সাপ: আসিফ

দুই যুগ আগের একটি গানকে ঘিরে একটি গল্প। সেই গানটি কেউই গাইতে চাইছিলেন না। তখন গানটি চেয়েছিল প্লেব্যাক সম্রাট এন্ড্রু কিশোরের কণ্ঠে বসতে। কিন্তু এন্ড্রু কিশোর তাকে গ্রহণ করেননি। তারপর গানটি গিয়েছিল সেসময়ের আরেক জনপ্রিয় কণ্ঠশিল্পী পলাশের নিকট। পলাশও একই ব্যবহার করেন। এদের ছাড়াও গানটি সেসময় আরও গিয়েছিল কণ্ঠশিল্পী হাসান আবিদুর রেজা জুয়েলের কণ্ঠে বসতে। কিন্তু বাকিদের মতো জুয়েলও ফিরিয়ে দেন।

সবাই যখন গানটিকে এভাবে ফিরিয়ে দিচ্ছিলেন তখন দেখা হয় নতুন এক গায়কের সঙ্গে। গানটি তার কাছেও গেল। আর গায়কটিও নিজের কণ্ঠে তুলে নিলেন গান। আর এরপরই বেধে গেল এক তুলকালাম কাণ্ড! চারদিকে হইচই ফেলে দিয়ে গানটি সেই গায়কের কণ্ঠকে পুষ্পক রথ বানিয়ে বানের জলের মতো ছড়িয়ে গেল সারাবাংলার আনাচে কানাচে। এদেশের সকল মানুষের হৃদয়কে একসাথে নাড়িয়ে দিল সেই তরুণ গায়কের কণ্ঠ।

গানটি যেন বিরহী প্রেমিকদের মনের কথা বলছিল। তাই উঠতি বয়সীদের গানটি নিয়ে উন্মাদনার শেষ ছিল না। ফলস্বরূপ সেই গানের অ্যালবামটি মানুষ কিনতে লাগল মুড়ির মতো। আর যে গায়কটি এই একগান দিয়ে নেড়েচেড়ে দিলেন সারাদেশকে, সেই গায়ককে সবাই ডাকা শুরু করল বাংলা সংগীতের যুবরাজ নামে। বলছিলাম বাংলা সংগীতের দরাজ কণ্ঠের গায়ক আসিফ আকবর ও তার বিখ্যাত সেই গান ও প্রিয়ার কথা।

সম্প্রতি কথা হলো বাংলা গানের এই যুবরাজের সঙ্গে। কথায় কথায় উঠে এলো অনেক কথা। জানা গেল অনেক কিছুই। সংগীতে আসিফ আকবরের পথচলা কুমিল্লা থাকাকালীন ফিকেল বয়েজ নামের একটি ব্যান্ড গঠনের মাধ্যমে।

‘ও প্রিয়া তুমি কোথায়’ গানটির মাধ্যমে জনপ্রিয়তা পান আফিস । ছবি: সংগৃহীত
আসিফ জানান, তিন বছরের স্থায়ীত্বকাল নিয়ে জন্ম নেওয়া এই ব্যান্ডটি এলআরবি, নগর বাউল, মাইলসের গান কাভার করে কুমিল্লা ও তার আশেপাশের জেলাগুলোতে বেশ সাড়া ফেলেছিল। পরে এদেশের সংগীত অঙ্গনে আসিফ পা রাখেন শওকত আলী ইমনের হাত ধরে রাজা নম্বর ওয়ান চলচ্চিত্রের মাধ্যমে। ১৯৯৮ সালে সিনেমার গানের জন্য ইমন একটি নতুন কণ্ঠ খুঁজছিলেন। আসিফ ছিলেন সেই নতুন কণ্ঠ। তার এই কণ্ঠের সঙ্গে ইমনের পরিচয় ঘটেছিল পিন্টু নামের এক গিটারিস্টের মাধ্যমে।

বাংলা সংগীতে আসিফের যাত্রাটি সিনেমা দিয়ে শুরু হলেও সেসময় সংগীতাঙ্গনে বিচরণটা তার রাজার মতো ছিল না। স্ত্রী ও সন্তান নিয়ে সে জীবন যাপন ছিল বেশ টানাপোড়েনের। একটা সময় আসিফের সঙ্গে দেখা হয় গীতিকার ও সুরকার ইথুন বাবুর। আসিফ একদিন স্টুডিওতে আলী আকরাম শুভর সংগীতে সিনেমার গানে কণ্ঠ দিচ্ছিলেন। ওই স্টুডিওর বাইরে তখন দাঁড়িয়েছিলেন ছিলেন ইথুন বাবু। আসিফের সেই দরাজ কণ্ঠ নাড়িয়ে দিয়েছিল ইথুন বাবুকে। সেদিনই তাকে দিয়ে নতুন একটি অ্যালবামের পরিকল্পনা করেন তিনি। আর এই অ্যালবামেরই একটি গান ছিল ও প্রিয়া তুমি কোথায়। এরপরের গল্প সবার জানা। সে গল্পজুড়ে শুধুই জয়ের কথা, সে গল্প জুড়ে শুধুই অর্জনের ছড়াছড়ি।

তারপর কেটে গিয়েছে প্রায় দুই যুগ। ক্যালেন্ডারের পাতা এখন শাসন করছে ২০২২ সাল। সালটি গানের এই মানুষটির জন্য বেশ গুরুত্বপূর্ণ। কেননা, এ বছরই যেমন দুই যুগ পূর্তি হতে চলেছে তার ক্যারিয়ারের তেমনই এ বছরই ও প্রিয়া গানটির বয়স হতে চলেছে ২১ বছর। আর এ বছরই পূর্ণ হতে চলেছে আসিফের বিবাহিত জীবনের ৩০ বছর। তাছাড়া এবছর আসিফ পা রেখেছেন জীবনের পঞ্চাশতম বসন্তে।

এতগুলো মাইলস্টোনের কাছাকাছি চলে আসায় আসিফ নিজেও বছরটিকে গুরুত্বপূর্ণ বলে স্বীকার করেন। এ কথা বলতে গিয়েই ক্যারিয়ারের দীর্ঘ দুই যুগ পার করতে বসা এই গায়ক জানান ক্যারিয়ারকে আরও প্রলম্বিত করার কথা। সেকারণেই প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানের গতানুগতিক গানগুলোর বাইরেও তিনি গুরুত্ব দিচ্ছেন নিজ উদ্যোগে ভালো সুর ও কথা নির্ভর গানের ওপর। গানের বিষয়ে কথা বলতে গিয়েই কথা ওঠে ওপার বাংলার প্রখ্যাত সংগীতজ্ঞ কবির সুমনের। এই কিংবদন্তির লেখা ও সুর করা গান ইতোমধ্যেই কণ্ঠে তুলেছেন আসিফ। তার দরাজ গলার গায়কীতে মুগ্ধ কবীর সুমন।

স্ত্রীর সঙ্গে আসিফ । ছবি: ফেসবুক
সেই ধারাবাহিকতায় আসিফের কণ্ঠে নতুন মাত্রা পেয়েছে সুমনের লেখা সিরিয়ার ছেলে, এখনও সেই আসিফ, একুশে ফেব্রুয়ারির ডাকসহ বেশকিছু গান। সবগুলো গান ভিন্নধর্মী। যদিও এ ধরনের গানের সঙ্গে আসিফের পথচলা নতুন নয়। কবীর সুমনের গানের বাইরেও বক্তব্য নির্ভর গানে অভ্যস্ত আসিফ। সদর ঘাটের পান, দাবাড়ুর চাল, মানুষের গানগুলো যেন সেকথাই বলে।

একজন কণ্ঠশিল্পীর রোজকার রুটিনে অত্যাবশ্যক হলো রেওয়াজ। সংগীতজ্ঞরা মনে করেন, একজন কণ্ঠশিল্পীর কণ্ঠকে সুস্থ ও সাবলীল রাখতে প্রয়োজন নিয়মিত রেওয়াজের। কিন্তু অবাক হলেও সত্য যে আসিফ রেওয়াজ না করেই রাজার মতো বিচরণ করছেন।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে এই গায়ক সংগীত বোদ্ধাদের মন্তব্যকে ফেলে দেন না। কেননা, এই উপমহাদেশে যেহেতু শাস্ত্রীয় সংগীতের আধিপত্য রয়েছে সেহেতু রেওয়াজের ওপর সংগীতজ্ঞদের গুরুত্ব দেওয়াটা যুক্তিযুক্ত। তবে তিনি বলেন, ‘রেওয়াজের বিচরণটা শুধুমাত্র এই উপমহাদেশেই। আন্তর্জাতিক সংগীতে রেওয়াজ বলে কিছু নেই। তারা আসলে প্রচুর পরিমাণে প্র্যাকটিস করেন কণ্ঠের সুস্থতার জন্য। অনেক কণ্ঠশিল্পীই আছেন, যারা নিয়মিত রেওয়াজ করেও সুরে গাইতে পারেন না। আসলে রেওয়াজ না কণ্ঠে সুরটাকে ধরতে পারা, সুরে গান গাওয়াটাই মুখ্য ব্যাপার।’

গায়ক আসিফ আকবরের জীবনে গানের বাইরে আরও একটি মুখ্য ব্যাপার হলো ক্রিকেট। তিনি একজন ক্রিকেটার। গান গেয়ে মানুষের মন জয় করার পূর্বেই কুমিল্লা ও তার আশেপাশের মানুষের মন জয় করেছিলেন বাইশ গজে দাড়িয়ে। এই বাইশ গজে আসিফের কারিশমা দেখেই তার প্রেমে পড়েছিলেন স্ত্রী সালমা আসিফ মিতু। ক্রিকেটের প্রতি ভালোবাসা থেকে ক্রিকেট নিয়ে গানও গেয়েছেন এই গায়ক। সে-ও অনেক বছর আগের কথা। এরপর ক্রিকেট নিয়ে এদেশের অনেক কণ্ঠশিল্পী গেয়েছেন। কিন্তু আসিফের সেই গানটির জনপ্রিয়তাকে আজ অবধি অতিক্রম করতে পারেনি কোনো গান।

আসিফ আকবর । ছবি: ফেসবুক
আসিফের ইচ্ছা ছিল সিস্টেম ডেভলপ করার। চেষ্টাও করেছিলেন তিনি। কিন্তু তার মতে এদেশের সংগীতের অধিকাংশ মানুষজনই মিউজিক ইন্ডাস্ট্রির কথা, তথা বৃহত্তর স্বার্থের কথা না ভেবে ব্যক্তি স্বার্থ উদ্ধারের উদ্দশ্যে লেজুড়বৃত্তিতে বেশি উৎসাহী। কিন্তু তাই বলে আসিফ হাল ছাড়েননি। অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে যুদ্ধ করে যাচ্ছেন একা একাই। কেননা তিনি বিশ্বাস করেন অধিকার কেউ কাউকে দেয় না। আদায় করে নিতে হয়। আর এই অধিকার আদায়ের উদ্দশ্যেই কোভিডকালীন গঠিত হয়েছিল সুরকার, গীতিকার ও সংগীত শিল্পীদের আলাদা আলাদা এবং যৌথ বেশকিছু সংগঠন। এই সংগঠনগুলোর লক্ষ্যই ছিল ন্যায্য পাওনা আদায়। কিন্তু আসিফ মনে করেন, তারা অধিকার আদায় করে নেওয়ার মনোবৃত্তির পরিবর্তে এগিয়েছিলেন কম্প্রোমাইজিং আলোচনার মাধ্যমে। ফলে আজও সে অধিকার আদায় হয়ে ওঠেনি।

সংগঠনগুলো জন্ম নেওয়ার সময় যে গর্জন দিয়েছিল তাও আজ অবশিষ্ট নেই। পাশাপাশি আসিফ ধুয়ে দেন কপিরাইট আইনের অফিসকেও। একে নখ-দন্তহীন সাপের সঙ্গে তুলনা করেন। উদাহরণ হিসেবে তিনি টেনে আনেন তরুণদের কাভার গানে বাধা দেওয়ার বিষয়টি। তিনি মনে করেন, এসবের কোনো দরকারই ছিল না। তরুণদের কাভার গান করার স্বাধীনতা না দিলে পুরনো গানগুলো কখনোই বেঁচে থাকবে না। পাশাপাশি কাভার গানে এ প্রজন্মের শিল্পীদের অতিমাত্রায় ব্যস্ত হওয়াটাকেও ভালো চোখে দেখছেন না তিনি। নির্দিষ্ট কণ্ঠশিল্পীদের অনুকরণ করে কাভার গানে এতটাই অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছেন যে, পরিবর্তী সময়ে মৌলিক গানে এসেও তাদের কণ্ঠে সেই ছায়া থেকেই যাচ্ছে।

গানের বাইরে গায়ক আসিফের আরেকটি পরিচয় হলো, তিনি একজন লেখক। নিজের ফেসবুক আইডিতে বিভিন্ন বিষয়ে নিয়মিত লেখালেখি করেন। সেসব লেখা তার ভক্তদের গণ্ডি পেরিয়ে বোদ্ধাজনদের নিকটও প্রশংসিত।
আসিফ জানান, লেখালেখির শুরুটা তার ছোটবেলা থেকেই। ছোটবেলায় স্কুল কলেজের ক্রোড়পত্রগুলোতে নিয়মিত লিখতেন আসিফ। পরবর্তীতে খেলাধুলা নিয়ে কুমিল্লার স্থানীয় পত্রিকা দৈনিক রুপসী বাংলায়ও লিখতেন নিয়মিত। এছাড়া তারকাখ্যাতি পাওয়ার পর বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকেও লিখেছেন এই গায়ক।

এদেশের যে কজন তারকার শক্তিশালী ভক্তদল রয়েছে তাদের মধ্যে অন্যতম আসিফ। প্রিয় শিল্পীর জন্মদিন পালনে তাদের উন্মাদনার শেষ নেই। কিন্তু ১৯৭২ সালের ২৫ মার্চ জন্ম নেওয়া আসিফ আকবর গত কয়েক বছর ধরে নিজের জন্মদিন পালন করেন না। আজকাল জন্মদিন নিয়ে ভক্তদের এই উন্মাদনাকে তিনি প্রশ্রয়ও দেন না। কেননা এই ২৫ মার্চ রাতেই এদেশের ঘুমন্ত নিরীহ মানুষের ওপর ঝাপিয়ে পড়েছিল সশস্ত্র পাক হানাদার বাহিনী। সেকারণে, রাষ্ট্রের কাছে এটি কালরাত। তাই রাষ্ট্রের প্রতি সম্মান প্রদর্শন পূর্বক এই গায়ক নিজের জন্মদিন উদযাপন থেকেও বিরত থাকেন প্রতিবছর।