সেতুটি নিয়ে দুর্ভোগে ১৫ গ্রামের মানুষ

আশপাশের অন্তত ১৫ গ্রামের মানুষকে যাতায়াতের জন্য ব্যবহার করতে হয় সেতুটি। সেতুর দুই পাশে রয়েছে বেশ কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও বাজার। উপজেলা সদর বা জেলা সদরে আসতে ওই সেতুটি ব্যবহার করা হয়। কিন্তু দীর্ঘদিন সংস্কার না করায় সেতুটি চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।

জীবন ও জীবিকার প্রয়োজনে আশপাশের গ্রামের অন্তত সাড়ে তিন হাজার মানুষকে প্রতিদিন পার হতে হয় সেতুটি। এই সেতু দিয়ে, নসিমন, ইজিবাইক, বাইসাইকেল ও মোটরসাইকেলও চলাচল করে।

গুরত্বপূর্ণ এই সেতুটি ফরিদপুরের নগরকান্দা উপজেলার লস্করদিয়া ও তালমা ইউনিয়নের মাঝামাঝিতে শীতলক্ষ্যা নদীর ওপর অবস্থিত। এটি মাঝিকান্দি সেতু হিসেবে পরিচিত।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সেতুটি ১৯৯৮ সালে নির্মিত হয়। ১২০ ফুট দৈর্ঘ্য ও সাত ফুট প্রস্থের সেতুটি নির্মাণ করে স্থানীয় সরকার বিভাগ। লোহার পাতের ওপরে কংক্রিট দিয়ে কাঠের সাঁকোর আদলে ছোট ছোট পাটাতন দিয়ে নির্মাণ করা হয়েছে সেতুটি। লোহার ১১টি পিলারের ওপর অবস্থিত সেতুটি। এক ফুট প্রস্থ বিশিষ্ট ১২০টি কনক্রিটের পাটাতনের ওপর সেতুটি অবস্থিত।

সরেজমিনে দেখা গেছে, দীর্ঘদিন সংস্কারের অভাবে সেতুটির লোহার চারটি পিলার জং ধরে অকেজো হয়ে পড়েছে। তিনটি রেলিংয়ের পূর্ব দিকের মাঝের রেলিংটি ভেঙে গেছে। সেতুর মাঝামাঝি জায়গায় সাতটি পাটাতনের বিভিন্ন জায়গায় ভেঙে গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। এবড়ো-থেবড়ো অবস্থায় রয়েছে। যাত্রী নামিয়ে রিকশা-ভ্যান টেনে ঝুঁকির মধ্যে দিয়ে সেতুটি পার হতে হয়। মাঝে মাঝে ছোট ছোট শিশুরা পাটাতনের গর্ত দিয়ে পানিতে পড়ে যাওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।

নদীটি ওই এলাকায় পূর্ব থেকে পশ্চিম দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। নদীর উত্তর পাড়ে লস্করদিয়া ইউনিয়নের মাঝিকান্দা এবং দক্ষিণে তালমা ইউনিয়নের শাকপাল দিয়া গ্রাম অবস্থিত।

এলাকাবাসী সূত্রে জানা গেছে, সেতুটি দিয়ে ওই এলাকার কদমতলী, চাপখন্ড, বিনোকদিয়া, সাভার, বরখাদিয়া, জয়পুর, মিয়ার গ্রাম, রসুলপুরসহ অন্তত ১৫টি গ্রামের অন্তত সাড়ে তিন হাজার মানুষ যাতায়াত করে। বিশেষ করে কদমতলী, সাভার, চাপখণ্ড, শাকপালদিয়া, রসুলপুর মিয়ার গ্রাম, জয়পুর এলাকার লোকজন বিনোকদিয়া মাঝিকান্দা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, লস্করদিয়া আতিকুর রহমান উচ্চ বিদ্যালয়, মাঝিকান্দা বাজার ও বিনোকদিয়া বাজার এলাকায় আসতে হয় এ সেতুটি পাড় হয়েইে। এ সেতুটি এড়িয়ে ওই এলাকার লোকদের যাতায়াত করতে হলে পশ্চিমে তিন কিলোমিটার দূরে অবস্থিত তালমা বাজার এবং পূর্বে আড়াই কিলোমিটার দূরে মনোহরপুর বাজার হয়ে ঘুরে আসতে হয়ে।

সেতুর দুই পাড়ে বেশ কয়েকটি বিদ্যালয় ও বাজার স্থাপিত। উত্তর পাড়ে বিনোকদিয়া মাঝিকান্দা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, লস্করদিয়া আতিকুর রহমান উচ্চ বিদ্যালয়, মাঝিকান্দা বাজার, বিনোকদিয়া বাজার এবং দক্ষিণ দিকে শাকপালদিয়া মাদরাসা, আল হেরা ইসলামি কিন্টারগার্টেন অবস্থিত।

কদমতলী গ্রামের বাসিন্দা ভ্যানচালক হারুন সরদার বলেন, এই সেতু দিয়ে ভ্যান নিয়ে আসলে বিপদে পড়তে হয়। সব যাত্রী নামিয়ে দেওয়ার পরও পেছন থেকে একজন না ঠেললে একলা টেনে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হয় না।

বিনোকদিয়া মাঝিকান্দা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী নাইম সর্দার (১০) বলে, এই সেতুর জন্য স্কুলে যেতে সমস্যা হয়। একবার সে নিজেও সেতুর মাঝামাঝি গর্ত দিয়ে পানিতে পড়ে গিয়েছিল। পরে সাঁতরে তাকে পাড়ে উঠতে হয়।

বাইসাইকেল নিয়ে বিনোকদিয়া বাজার থেকে মনোহরপুর গ্রামে যাতায়াতকারী মোহন মিয়া (২৮) বলেন, গত ১০ বছর ধরে সেতুর এই অবস্থা। আমরা ইউপি চেয়ারম্যানের কাছে বার বার ধরনা দিয়ে কোনো ফল পাইনি।

মাঝিকান্দা গ্রামের বাসিন্দা শ্রমিক রিপন সরদার (২৯) বলেন, ‘মাঝে মাঝে ব্রিজের লোকজন আইসা গজ ফুট ধইরা মাইপা নিয়া যায় । সাংবাদিকরা আইসা ছবি তুলে, কিন্তু আমাদের সেতুর কোনো উন্নতি ঘটে না। এই সেতু কবে হয়, তা কেউ বলতে পারে না।’

কদমতলী গ্রামের প্রবীণ ব্যক্তি আব্দুর রাজ্জাক (৭১) বলেন, আমরা কমতলাবাসী যেন অবহেলিত হয়েই পড়ে আছি। আমাদের যেন দেখার কেউ নেই। নইলে সেতুর কি এই অবস্থা থাকে, দশ বছর ধরে।

তালমা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান কামাল হোসেন বলেন, আমাকে এই সেতু দিয়েই চলাচল করতে হয়। এটা তো আমার নিজেরই পথ। এলাকাবসীর কথা কি বলবো, আমি নিজেই তো ভুক্তভোগী।

তিনি বলেন, স্থানীয় সরকার বিভাগ সেতুটি নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে। এ কাজটি বাস্তবায়িত হলে আমাদের দুর্ভোগের অবসান হবে।

এ ব্যাপারে নগরকান্দা উপজেলা প্রকৌশলী মোশাররফ হোসেন বলেন, মাঝিকান্দিতে পুরাতন সেতুর জায়গায় নতুন একটি সেতু নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়। ওই জায়গায় ৩৯ মিটার দৈর্ঘ্য এবং সাত দশমিক দুই মিটার প্রস্থের একটি সেতু নির্মাণের জন্য নকশা করা হয়েছে। সাড়ে চার কোটি টাকার প্রাক্কলন মূল্য ধরে এটি এলজিইডি ঢাকার প্রকল্প পরিচালকের দফতরে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। অনুমোদন পাওয়া গেলে দরপত্র আহ্বান করে কাজ শুরু করা হবে।