‘নয়ডা গুরাগারা খাইলো খালে, হেরপরও এউক্কা ঘর জুডলো না’

বরগুনা শহরের বাজার ব্রিজের নিচে দীর্ঘ ৩০ বছরেরও বেশি সময় ধরে বসবাস ৭০ বছর বয়সী আলেয়া বেগম। সমাজের ছিন্নমূলদের জন্য আবাসন ব্যবস্থার দাবিতে যখন আন্দোলন শুরু হয়, তখন আলেয়া ছিলেন সব মিছিল ও সমাবেশের সামনে। তবুও মাথা গোঁজার মতো একটি ঘর মেলেনি তার। স্বামী পরিত্যাক্তা আলেয়ার ১০ সন্তানের ৯ জনই কেড়ে নিয়েছে ভাড়ানী খাল। এখন ব্রিজের নিচে খুপরি ঘরে বসে মৃত্যুর প্রহর গুনছেন তিনি।

জানা যায়, বৃদ্ধা আলেয়া বেগমের গ্রামের বাড়ি বরগুনার এম বালিয়াতলী ইউনিয়নের মনসাতলী গ্রামে। তার শ্বশুরবাড়িও ছিল একই গ্রামে। ৩০-৩২ বছর আগে সংসারে অভাব অনটনের কারণে মায়ের সঙ্গে বরগুনায় চলে আসেন আলেয়া। তখন থেকেই শুরু হয় তার আশ্রয়হীন জীবন। প্রথমে বরগুনার মাছ বাজার ও সবজি বাজারে ভাসমানভাবে রাত্রিযাপন করতেন তিনি।

এরপর শহরের প্রাণকেন্দ্রে ভাড়ানী খালের উত্তর প্রান্তে তৎকালীন কাঠের ব্রিজের নিচে বসবাস শুরু করেন। নৌকায় চাল ওঠানোর সময় নিচে পড়ে যাওয়া চাল কুড়িয়েই পেট চলত আলেয়ার। সময়ের ব্যবধানে কাঠের ব্রিজের বদলে এখানে এখন আধুনিক কংক্রিটের ব্রিজ নির্মিত হলেও ভাগ্য বদলায়নি আলেয়ার। ৩০ বছরেও মাথা গোঁজার ঠাঁই মেলেনি তার। ব্রিজের নিচের খুপরি ঘরেই তিনি জন্ম দিয়েছেন ৮ ছেলে ও এক মেয়ে। যাদের সকলকেই কেড়ে নিয়েছে খরস্রোতা ভাড়ানী খাল।

সরেজমিনে দেখা যায়, বরগুনার ভাড়ানী খালের প্রধান ব্রিজের নিচে পশ্চিম পাড়ে ছোট একটি খুপরি ঘর আলেয়ার। ঘরের ভেতরে নেই কোনো আসবাবপত্র। ব্রিজের ঢালে পাটের বস্তা দিয়ে তোষক বানিয়ে সেখানেই রাত্রিযাপন করেন আলেয়া। জোয়ারের পানিতে খুপরি ঘরে প্রবেশ করছে পানি, সঙ্গে পোকামাকড়। তার ১০ সন্তানের মধ্যে বেঁচে থাকা একমাত্র সন্তান জাহাঙ্গীর স্ত্রী-সন্তান নিয়ে অন্যত্র থাকেন। আলেয়া এখনও কাজ করছেন পৌরসভার পরিচ্ছন্নতা কর্মী (ঝাড়ুদার) হিসেবে। পৌরসভা থেকে মাসে ৪ হাজার টাকা বেতন পান। যা ওষুধ কিনতেই শেষ হয়ে যায়। খুপরি ঘরেই মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন তিনি। সংশ্লিষ্ট অফিসে একাধিকবার দৌড়াদৌড়ি করেও মাথা গোঁজার মতো একটা ঘর জোটেনি তার।

আলেয়া বেগম বলেন, ‘ঘরের লইগ্গা যেহানেই যাই, তারাই আমারে উপজেলায় যাইতে কয়। উপজেলায় যাইয়া যহন তাগো দারে ঘরের কতা কই, তহন তারা কয় ১৫ হাজার টাহা লাগবে ঘর পাইতে হইলে। আমি গরিব মানুষ, এতগুলা টাহা কই পামু।’

তিনি আরও বলেন, ‘শেখ হাসিনা এতো মানষেরে ঘর দিল, কিন্তু আমি দোষ করলাম কী! আমার কফালে কি এউক্কা ঘর জোডবে না? ৩০ বছর ধইরা এই ব্রিজের তলে থাহি। একে একে আমার ৯ ডা গুরাগারা এই খালের পানিতে ডুইব্বা মরছে। বহুত নেতাগো পাও ধইরাও একটা ঠাঁই হইলো না মোর।’

আলেয়া বেগম বলেন, ‘তিরিশ বছর আগে আগে মায়ের লগে আইয়া বাজারে ভাসমান থাকছি। হেরপর হইতেই এই ব্রিজের তলে আছি। গুরাগারা অইতো আর কয় মাস বয়স হইলেই মরতো। এ কারণে স্বামী ছাইড়া গেছে, হে এহন আরেক বউর দারে থাহে। এহানে কোনো মানুষ থাকতে পারে না, জোয়ার আইলেই কাঁথা-বালিশ সব ভিজে যায়। মশার কামড়ে কয়েকবার ডেঙ্গু হইলেও আল্লাহ আমারে নিয়া যায় নাই। আরও কষ্ট দেওয়াইবে বইল্লা বাঁচাইয়া রাখছে।’

বরগুনা নাগরিক অধিকার সংরক্ষণ কমিটির সভাপতি হাচানুর রহমান ঝন্টু বলেন, সমাজে এত জনপ্রতিনিধি থাকতেও কেন আলেয়া বেগম ঘর পাননি। আদৌ তার ভাগ্যে প্রধানমন্রীর উপহার আছে কিনা তা আমাদের জানা নেই। হয়ত দপ্তরে ক্ষমতাধারী কেউ নেই আলেয়ার। এ জন্যই তিনি মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন।

বরগুনা পৌরসভার মেয়র কামরুল আহসান মহারাজ বলেন, আলেয়ার বিষয়টি শুনেছি। এটি অত্যন্ত দুঃখজনক। আলেয়া যাতে একটি ঘর পান, সেজন্য আমি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে সুপারিশ করব।

এ বিষয়ে বরগুনার জেলা প্রশাসক হাবিবুর রহমান বলেন, আলেয়ার বিষয়টি আমরা গুরুত্বের সঙ্গে দেখছি। আলেয়ার জন্য একটি ঘরের ব্যবস্থা করা হচ্ছে।