নিরসন হবে ‘হাতি-মানুষের সংঘাত’, গারো পাহাড়ে স্বস্তির নিশ্বাস

শেরপুরের গারো পাহাড়ে যুগ যুগ ধরে চলে আসছে হাতি ও মানুষের লড়াই। এ লড়াইয়ে প্রাণ গেছে বহু পাহাড়ির, মারা গেছে অনেক হাতি। ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে কোটি টাকার ফসলের। হাতি ভেঙেছে অনেক ঘরবাড়ি। চলমান এ দ্বন্ধ নিরসনে গারো পাহাড়ে তৈরি হচ্ছে বন্য হাতির জন্য ‘অভয়ারণ্য’। ইতোমধ্যে জমি নির্ধারণ ও মালিকানা চিহ্নিত করার কাজ শুরু করেছে বন বিভাগ। পাশাপাশি জবর দখলে থাকা বনভূমিও উদ্ধারে কাজ করছে বলেও জানা গেছে।

জানা যায়, জেলার শ্রীবরদী, ঝিনাইগাতী ও নালিতাবাড়ী উপজেলার বিশাল এলাকা জুড়ে অবস্থিত গারো পাহাড়। এক সময় এই বনাঞ্চলে অবাধে ঘুরে বেড়াতো বন্য হাতির দল। কিন্তু পাহাড়ে মানুষের বসতি দিন দিন বৃদ্ধি পাওয়া বন্ধ হয়ে যায় হাতি চলাচল। এতে খাবারের সন্ধানে লোকালয়ে নামে হাতির দল, তখনই শুরু হয় হাতি মানুষের দ্বন্দ্ব। এ দ্বন্দ্বে গত তিন মাসের ব্যবধানে গারো পাহাড়ে চারটি বন্য হাতির মৃত্যু হয়। এ নিয়ে গত ১৫ বছরে নানা কারণে প্রায় ৩০/৩৫টি বন্য হাতির মৃত্যু হয়। বিপরীতে বন্য হাতির আক্রমণে জেলায় প্রায় ৯০ জন মানুষ মারা যান, আহত হন শতাধিক মানুষ।

আবার হাতি হত্যার দায়ে কারাভোগও করছেন অভিযুক্তরা। শ্রীবরদীর মালাকোচা এলাকায় বিদ্যুতের সংযোগ দিয়ে একটি হাতি হত্যায় এবারই প্রথমবারের মতো মামলা হয়। এই মামলায় অভিযুক্ত চারজনই কারাগারে যান।

অবশেষে হাতি মানুষের দ্বন্দ্ব নিরসনে গারো পাহাড়ের সীমান্ত দিয়ে তৈরি হচ্ছে বন্য হাতির ‘অভয়ারণ্য’। ইতোমধ্যে জরিপ কাজ শুরু করেছে বন বিভাগ। এদিকে হাতির ‘অভয়ারণ্য’ হবে এই খবরে স্বস্তি ফিরেতে শুরু করেছে জনমনে। স্থানীয়দের আশা, হাতিদের জন্য অভয়ারণ্যে হলে কৃষকদের ফসলের কোন ক্ষতি হবে না, পাশাপাশি বাড়ি-ঘরে হামলাও করবে না হাতির দল।

শ্রীবরর্দী উপজেলার রাণীশিমুল ইউনিয়নের রাঙাজান গ্রামের শাহিন মিয়া বলেন, আমি দুই একর জমিতে ধান গারছি (রোপন করা)। এখন হাতি প্রতি রাতেই নামে। ক্ষেতে যদি একবার নামে, তো সব খাইয়া নষ্ট করে ফেলবে।

ঝিনাইগাতী উপজেলার নওকুচী এলাকার কৃষক ছামেদুল মিয়া বলেন, ‘বাপু হাত্তি (হাতি) যদি আমগর (আমাদের) হইতি (এদিকে) না আহে (আসে), তাইলে তো ভালাই হবো, আঙগর (আমাদের) কোনও ক্ষতি হবো না। সরহার (সরকার) যে সিস্টেম (উদ্যোগ) হাতে নিছে খুব বালা (ভালো) হবো।’

খ্রিষ্টান পাড়ার ইলিসন সাংমা বলেন, ‘আমরা হুনতাছি (শুনতেছি) হাত্তির (হাতি) জন্য গুনার (রাস্তা) করবো, যদি গুনার করে তাহলে তো বালাই (ভালো) হবো, আমরা শান্তিতে এল্লা (একটু) ঘুমাবার পামু, আমাদের ঘরে আর হাত্তি (হাতি) আইবো না।’

ঝিনাইগাতীর ছোট গজনী এলাকার বাসিন্দা ডিবিশন সাংমা জানান, এ এলাকায় প্রায় প্রতিদিনই হাতির দল আসে, এজন্য বেশিরভাগ সময় আমাদের এখানকার মানুষ রাত পর্যন্ত জেগে থাকে। যদি অভয়ারণ্যে হয় খুব ভালো হবে।

বালিজুড়ি গ্রামের বাসিন্দা হোসেন আলী বলেন, ‘আমরা খুব খুশি। কারণ আমাদের এ এলাকা গজনীর পাশাপাশি, এজন্য প্রায় প্রতিদিনই হাতির দল আসে এবং হানা দেয় বাড়ি-ঘরে। পরে আমরা ঢাক-ঢোল পিটিয়ে হাতির দলকে তাড়া দেই।’

নালিতাবাড়ীর কালাকুমা গ্রামের কৃষক লাল মিয়া বলেন, ‘মেলা দিন (অনেক দিন) ধইরি হুনতাছি (শুনতেছি) হাত্তির (হাতি) জন্য আস্তা (অভয়ারণ্যে) হবো, কই হয় না তো, এল্লে (এগুলো) হুদাই। যদি আস্তা (অভয়ারণ্যে) হয় তাহলে তো বালাই (ভালো) অইবো (হবে)।’

garo-pahar-4পরিবেশ বাদী সংগঠন সবুজ আন্দোলনের শেরপুর জেলার সাধারণ সম্পাদক সাবিহা জামান শাপলা বলেন, হাতি মানুষের দ্বন্দ্ব নিরসনে আমরা দীর্ঘদিন ধরে গারো পাহাড়ে অভয়ারণ্যে করার জন্য দাবি করে আসছিলাম, অবশেষে সীমান্তে অভয়ারণ্যে করার ঘোষণা এসেছে, এতে আমরা খুব খুশি। আশা করি, দ্রুত সময়ের মধ্যে তা বাস্তবায়ন হবে।

বাংলাদেশ এলিফ্যান্ট রেসপন্স টিমের প্রশিক্ষক আদনান আযাদ বলেন, গারো পাহাড়ে গত তিন মাসে চারটি হাতি মারা গেছে, এটা খারাপ খবর। আর সেখানে হাতির জন্য অভয়ারণ্য হবে এটা ভালো খবর। তবে এর আগে গারো পাহাড় হতে জবর দখলদারদের উচ্ছেদ করতে হবে। তাহলেই পাহাড়ে অভয়ারণ্য পরিপূর্ণতা পাবে।

রাংটিয়া রেঞ্জের দায়িত্বে থাকা মুকরুল ইসলাম বলেন, মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে গারো পাহাড়ে অভয়ারণ্যের জন্য আমরা জমি নির্ধারণ ও মালিকানা চিহ্নিত করার কাজ শুরু করেছি। এছাড়া পাহাড়ে অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদ অভিযান চলমান রয়েছে।

শ্রীবরদীর বালিজুড়ির ভারপ্রাপ্ত রেঞ্জ অফিসার মো. রবিউল ইসলাম বলেন, ‘বালিজুড়ি, ঝিনাইগাতী ও নালিতাবাড়ী পর্যন্ত হাতির জন্য অভয়ারণ্যে হবে। ইতোমধ্যে মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে আমরা জমি নির্ধারণ ও মালিকানা চিহ্নিত করার কাজ করছি। পাশাপাশি অবৈধভাবে জবর দখল করে থাকা জমিগুলোও উদ্ধার শুরু করেছি। আমরা আশা করি, গারো পাহাড়ের যে একটা ঐতিহ্য তা খুব দ্রুত সময়ের মধ্যে ফিরে আসবে।

জেলা প্রশাসক মো. মোমিনুর রশীদ বলেন, অভয়ারণ্যের প্রস্তাবটি পাস হয়ে বন মন্ত্রনালয়ের মাধ্যমে বন বিভাগে রয়েছে। ইতোমধ্যে শুরু করেছে প্রাথমিক কাজ শুরু হয়েছে। আশা করছি, হাতি-মানুষের যে একটা দীর্ঘদিনের সংঘাত তা শেষ হবে।