নানা সংকটের মাঝেও জনপ্রিয়তা বাড়ছে তাঁত শিল্পের

নানা সংকটের মাঝেও সম্ভাবনাময় জনপ্রিয়তা বাড়ছে টাঙ্গাইলের বাসাইলের তাঁত শিল্পের। তাঁতে বুনানো শাল-চাদর তাঁতীদের তৈরি শাল-চাদর গুণে, মানে ও বাহারী ডিজাইনের কারণে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে সারাদেশে। তৈরীতে মহাব্যস্ত মালিক-শ্রমিকরা।

টাঙ্গাইলের তাঁতের শাড়ীর পাশাপাশি দিন-দিন কদর বাড়ছে বাসাইল উপজেলার বাথুলীসাদী এলাকার তৈরি শাল চাদরের। তাঁতের তৈরী বাহারী রং ও ডিজাইন আর নিঁপুণ কারুকার্যে আর্কষণীয় শীতের পোশাক শাল-চাদর। এখন প্রায় সব বয়সের নারী-পুরুষের পছন্দ। উপজেলার বাথুলীসাদী তাঁতপল্লীর তাঁতে তৈরী এসব শাল-চাদর পৌঁছে যাচ্ছে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলার শো-রুমগুলোতে।

শীত মৌসুমের হিমেল ঠান্ডা শরীর গরম রাখতে সব বয়সী মানুষের প্রয়োজন শীতের পোশাক। শীতের পোষাকের তালিকায় সব বয়সী নারী-পুরুষের মনে স্থান করে নিয়েছে টাঙ্গাইলের বাসাইল উপজেলার বাথুলীসাদী গ্রামের তাঁতে তৈরী শাল-চাদর। বাহারি রঙের সুতায় হাত ও তাঁতকলে নিপুণ কারুকার্যে ও আর্কষণীয় ডিজাইনের তৈরি হচ্ছে শাল চাদর। এ অঞ্চলের এসব শাল গুণে-মানে অতুলনীয়। দেশের বিভিন্ন এলাকার শ্রমিকরা এ পল্লীর কারখানা গুলোতে মনিপুরি, পাট্টা, হাই চয়েজ, নয়ন তারা, ফ্লক প্রিন্টসহ বাহারী নাম ও ডিজাইনের প্রায় ২৫ ধরনের চাঁদর তৈরি করেন। দুই থেকে আড়াই হাত প্রস্থ এবং চার থেকে পাঁচ হাত দৈর্ঘ্যে তৈরী হয় শাল চাদর। বর্তমানে এসব এলাকার শাল-চাদর প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত ও দক্ষ কারিগড় দ্বারা ফ্যাশান উপযোগী করে তৈরি করা হচ্ছে বলে জানান কারিগড়রা।

বাথুলীসাদী ছাড়াও এ অঞ্চলের গড়াসিন, হাবলা, আদাবাড়ির তাঁত পল্লীতেও তৈরি হচ্ছে এসব চাদর। পার্শ্ববর্তী উপজেলা দেলদুয়ার, কালিহাতী ও সদর উপজেলার বিভিন্ন তাঁতপল্লীতেও শাল-চাদর তৈরী হয়। এ অঞ্চলের সহস্রাধিক পরিবার শাল-চাদর তৈরি করে জীবিকা নির্বাহ করছেন।

বাথুলীসাদীর তাঁত মালিক-শ্রমিকদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, সারা বছর শাড়ীর তৈরীর পাশাপাশি শাল-চাদর তৈরী করে মজুদ করলেও হেমন্তের শুরুর আগ থেকে শীত মৌসুমের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত শাল-চাদর তৈরীর কাজে বেশি ব্যস্ত সময় পার করেন।

তাঁত শ্রমিকরা জানান, একজন শ্রমিক দিনে ৩-৪ টা শাল-চাদর তৈরী করেন। এতে যা মুজুরি পান তাতে কোনো রকমে তাদের সংসার চলে।

তাঁত মালিকরা জানান, সুতাসহ অন্যান্য উপকরণের মূল্য বৃদ্ধির কারণে তাদের শাল-চাদর তৈরীর প্রধান প্রতিবন্ধকতা। অল্প পুঁজি নিয়ে তারা শাল-চাদর তৈরী করছেন। এ অঞ্চলে তৈরী ফ্যাশনেবল শাল-চাদর ইতিমধ্যে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় চলে যাচ্ছে বিক্রির জন্য।

বাথুলী সাদীর তাঁত মালিক শাহ আলম মিয়া জানান, অর্থনৈতিক সংকট, কাঁচামালের দাম বৃদ্ধির পাশাপাশি বৈশ্বিক উষ্ণায়নেরর ফলে শীতের স্থায়িত্ব কমে যাওয়ার কারণে কয়েক বছর ধরে উৎপাদিত চাঁদর বিক্রির লক্ষমাত্রা পুরণ হচ্ছে না।

বাথুলী সাদী তাঁত উন্নয়ন সমবায় সমিতির সাধারণ সম্পাদক ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী এমবি এন্টাপ্রাইজের তাঁতী বাদল হক জানান, সারা বছর পুঁজি খাটিয়ে চাঁদর তৈরি করে মজুত করতে হয়। এতে যে পরিমাণ পুঁজির প্রয়োজন তার জোগান দেয়া সম্ভব হয় না। সরকারি-বেসরকারি উদ্যোক্তাদের সহায়তা পেলে ঐতিহ্যবাহী এই শিল্প দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

তাঁত মালিক সমিতির সভাপতি লাল মিয়া বলেন, ঐতিহ্যবাহী এই শিল্প টিকিয়ে রাখতে হলে সরকারিভাবে তাঁত মালিকদের স্বল্প সুদে ঋণ সুবিধা প্রদান এবং বিদেশে রফতানির সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। তবেই দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা রাখতে পারবে এ শিল্প।

টাঙ্গাইল তাঁত বোর্ডের লিয়াজোঁ কর্মকর্তা রবিউল ইসলাম জানান, তাঁতে তৈরী শাড়ির পাশাপাশি শাল-চাদর শিল্পটির সম্প্রসারণের জন্য কাজ করছে জেলা তাঁত বোর্ড। সুষ্ঠু বাজার ব্যবস্থাপনা, সরকারি-বেসরকারী প্রণোদনার পরিধি বাড়ানো এবং সরকারি পৃষ্টপোষকতার মাধ্যমে শীত প্রধান দেশগুলোতে এসব শাল-চাদর রফতানীর উদ্যোগ নেয়া গেলে আরো অনেকদূর এগিয়ে যাবে এ শিল্প।