দুর্গম পাহাড়ে আলী বাহাদুরের বাহাদুরিতে!

দুর্গম পাহাড়ে গাছ টানতে আনা পালিত হাতি ‘আলী বাহাদুর’। দলছুট হয়ে উম্মাদ ও নিয়ন্ত্রণহীনভাবে ঘুরে বেড়াচ্ছে এদিক-সেদিক। ইতিমধ্যে আক্রমণ চালিয়ে কেড়ে নিয়েছে আনিসুর রহমান (৩০) নামে এক দিনমজুরের প্রাণ। তার হামলায় মো. নাছির নামে আরেকজন গুরুতর আহত হয়ে লামা সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছে। একের পর এক মানুষের বসতবাড়ি, ফসলের মাঠ ও বাগান ধ্বংস করে যাচ্ছে পালিত এই হাতির পালটি। অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠা আলী বাহাদুরকে কোনভাবেই যেন নিয়ন্ত্রন করা যাচ্ছে না। এতে করে আতঙ্কে রয়েছে দুর্গম পাহাড়ের ১৭ গ্রামের কয়েক হাজার মানুষ।

বান্দরবান জেলার লামা উপজেলার চুমপুং হেডম্যান পাড়া সংলগ্ন তামাক চাষ করেন মো. ওমর ফারুক বাবুল।

তিনি বলেন, গত শুক্রবার (৪ মার্চ) বিকেলে আমার বাড়ির কাজের লোক আনিসুর রহমানকে ক্ষেতে কাজ করার সময় আক্রমণ চালিয়ে মেরে ফেলেছে হাতি আলী বাহাদুর। রোববার (৬ মার্চ) সকালে তার লাশ রংপুর পীরগাছা নিজ বাড়িতে পৌঁছানোর পর দুপুরে দাফন করা হয়েছে। মো. নাছির নামে আরও একজনকে আহত করেছে হাতিটি।

জানা যায়, লামা উপজেলার রূপসীপাড়া ইউনিয়নে দুর্গম এলাকায় পাহাড়ে গাছ টানতে সিলেট মৌলভীবাজার থেকে ৩টি কোম্পানির মাধ্যমে আনা হয়েছে ১৮টি পালিত হাতি। মো. আব্দুল মালেক (১৪টি), মি. ইসাচন্দ্র মাস্টার (২টি) ও মো. মনজুর (২টি) নামে তিন হাতির কোম্পানি এইসব হাতিগুলো নিয়ন্ত্রণ করে ও দৈনিক গাছ টানতে ভাড়া দেয়। কিন্তু হাতিগুলোর সঠিক পরিচর্যা ও নিয়ন্ত্রণ না থাকায় স্থানীয় মানুষের ব্যাপক ক্ষতি করছে। পালিত হাতির পালের সবচেয়ে বড় পুরুষ হাতি আলী বাহাদুর দলছুট হয়ে এদিক-সেদিক ঘুরে বেড়াচ্ছে ও মানুষের ক্ষতি করে চলেছে। ১৮টি হাতি নিয়ন্ত্রণে ১৮ জন মাহুত (পরিচর্যাকারী) থাকার কথা থাকলেও রয়েছে মাত্র ৬ জন।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ১৮টি হাতি থাকলেও বন বিভাগের অনুমোদন রয়েছে ৬টি হাতির। সারাদিন হাতিগুলোকে অমানবিক পরিশ্রম করানো হলেও তাদের খাওয়া-দাওয়া ঠিকমত দেয়া হয় না। আঘাত পাওয়া হাতিগুলোকে কোন পরিচর্যাও করা হয় না। স্থানীয়রা জানায়, গত ২ বছরের এই পালের ৩টি হাতি মারা গেছে। গর্ভবতী হাতি ও বাচ্চা হাতি দিয়েও গাছ টানানো হয়। উম্মাদ হাতি আলী বাহাদুরের কারণে রূপসীপাড়া ইউনিয়নের দুর্গম এলাকার চুমপুং হেডম্যান পাড়া, ছত্র পাড়া, আলীয়াং ত্রিপুরা পাড়া, রিয়াং পাড়া, আলীয়াং বাঙ্গালী পাড়া, মিশু মুরুং পাড়া, পানিস্যা ঝিরি, পবলা মুরুং পাড়া, নিডই মুরুং পাড়া, কুইরিং মুরুং পাড়া, তিন গুইজ্জা পাড়া, নাইক্ষ্যং বাজার, ডলুঝিরি মুরুং পাড়া, ব্যাং ঝিরি, বড় কলার ঝিরি, মেনতা মুরুং পাড়া ও রঞ্জু মুরুং পাড়ার মানুষ খুবই আতঙ্কে রয়েছে।

চুমপুং হেডম্যান পাড়া সংলগ্ন তামাক চাষি মো. ওমর ফারুক বাবুল বলেন, হাতির পালটি আমার ২-৩ লাখ টাকা তামাকের ক্ষেত নষ্ট করেছে। হাতির ভয়ে এলাকা ছেড়ে রূপসীপাড়া বাজারে চলে এসেছে আমার পরিবার। মাঠে তামাক পড়ে আছে। এখন তামাক তুলতে না পারলে আমার ৮-৯ লাখ টাকার ক্ষতি হয়ে যাবে।

পার্শ্ববর্তী ছত্র পাড়ার বাসিন্দা ওয়েলফা ত্রিপুরা ও বথি ত্রিপুরা জানায়, হাতির পালটি হামলা চালিয়ে তাদের লক্ষাধিক টাকার ক্ষতি করেছে। তারা এখন জীবন নিয়ে শঙ্কায় রয়েছে।

এ বিষয়ে লামা বন বিভাগের সহকারী বন সংরক্ষক খন্দকার মো. গিয়াস উদ্দিন বলেন, হাতির আক্রমণে মানুষ মৃত্যুর বিষয়টি জানতে পেরে শুক্রবার রাতেই ঘটনাস্থলে বন বিভাগের একটি টিম পাঠানো হয়েছে। দলছুট হাতিটি নিয়ন্ত্রণে অভিজ্ঞ মাহুত আনা হচ্ছে।

লামা উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. মোস্তফা জাবেদ কায়সার বলেন, হাতির আক্রমণে মৃত্যুর বিষয়টি দুঃখজনক। হাতির কোম্পানির সাথে আলাপ করে দ্রুত হাতির পালটি সরিয়ে নিতে ইউপি চেয়ারম্যান ছাচিং প্রু মার্মাকে বলা হয়েছে।