তদন্তে গতি নেই, ৫৬ মামলার একটিরও চার্জশিট হয়নি

স্বাধীনতার সূবর্ণজয়ন্ত্রীর উদযাপন উপলক্ষে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশ সফরের বিরোধিতা করে গত বছরের ২৬-২৮ মার্চ ব্রাহ্মণবাড়িয়ার তিন উপজেলায় ব্যাপক তাণ্ডব চালায় হেফাজতে ইসলামের নেতাকর্মীরা। জেলা সদর, আশুগঞ্জ ও সরাইলের সেসব তাণ্ডবের ঘটনায় মামলা হয় ৫৬টি। তাণ্ডবের এক বছর পার হলেও কোনো মামলার অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দিতে পরেনি পুলিশ। এর ফলে তাণ্ডবে জড়িতদের বিচার নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন ক্ষতিগ্রস্তরা।

জানা গেছে, স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর অনুষ্ঠানে যোগ দিতে গত বছরের ২৬ মার্চ ঢাকায় আসেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। তার আগমনের বিরোধিতা করে হেফাজতে ইসলামের নেতাকর্মী এবং অনুসারীরা ২৬-২৮ মার্চ পর্যন্ত ব্যাপক তাণ্ডব চালায় ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদরসহ তিন উপজেলায়। তাণ্ডবে রেলওয়ে স্টেশন, পুলিশ সুপারের কার্যালয় ও সদর মডেল থানার ২নং ফাঁড়ি, সিভিল সার্জনের কার্যালয়, জেলা পরিষদ কার্যালয় ও ডাকবাংলো, পৌরসভা কার্যালয়, ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রেসক্লাব ভবন, আলাউদ্দিন খাঁ পৌর মিলনায়তন ও সুর সম্রাট দি আলাউদ্দিন সঙ্গীতাঙ্গণ, সদর উপজেলা ভূমি অফিস ও জেলা গণগ্রন্থাগার, খাঁটিহাতা হাইওয়ে থানা এবং শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত ভাষা চত্বরসহ সরকারি-বেসরকারি অনেক স্থাপনায় ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করে। তিন দিনের ওই তাণ্ডবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে প্রাণ হান ১১ হেফাজত সমর্থক।

জেলা পুলিশের দেওয়া তথ্যমতে, তাণ্ডবের ঘটনায় ৩৫ হাজারের বেশি মানুষকে আসামি করে ৫৬টি মামলা করা হয়। আসামিদের মধ্যে ৪১৪ জন এজহারনামীয়, বাকিরা সবাই অজ্ঞাত। ঘটনার পর এজহারনামীয় ৪৬ জন এবং সন্দেহভাজন ৭১২ জনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। এদের মধ্যে হেফাজতে ইসলামের নেতৃত্বস্থানীয় কয়েকজন নেতাও ছিলেন। তবে তাদের সবাই জামিনে আছেন। বর্তমানে কারাগারে আছেন ১২০ জন।

৫৬ মামলার মধ্যে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) ১০টি, পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) ৯টি, জেলা পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ (ডিবি) ৪টি, সদর মডেল থানা পুলিশ ২৭টি, আশুগঞ্জ থানা ৩টি ও সরাইল থানা পুলিশ ২টি এবং আখাউড়া রেলওয়ে থানা পুলিশ একটি মামলা তদন্ত করছে।

ভয়াবহ ওই তাণ্ডবের ঘটনায় এক বছর পার হলেও কোনো মামলার তদন্ত কাজ শেষ করতে পারেনি কর্মকর্তারা। অধিকাংশ মামলার বাদীদের সঙ্গে তদন্ত কর্মকর্তাদের কোনো যোগাযোগ নেই। ফলে মামলার অগ্রগতি সম্পর্কেও জানতে পারছেন না বাদীরা।

HEFAJOT-4হেফাজত তাণ্ডবের একটি মামলার বাদী শফিকুল ইসলাম জানান, তার অফিস ভাঙচুরের মামলাটির তদন্তভার আছে সদর মডেল থানা পুলিশের কাছে। ঘটনার পর তার সঙ্গে তদন্তকারী কর্মকর্তা কয়েকবার যোগাযোগ করে মামলা সংক্রান্ত বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করেন। এরপর থেকে তার সঙ্গে তদন্ত কর্মকর্তা আরও কোনো যোগাযোগ করেননি। ফলে তার মামলাটি কোনো পর্যায়ে আছে, সেটি তিনি জানতে পারছেন না। দ্রুত মামলার তদন্ত কাজ শেষ করে দোষীদের গ্রেপ্তার করে শাস্তির আওতায় আনার দাবি জানান তিনি।

হেফাজতের তাণ্ডবের শিকার জেলা পরিষদ কার্যালয় ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ মামলার বাদী আব্দুল হামিদ জানান, জেলা পরিষদ ভবন ও ডাকবাংলোর সংস্কার করে এখন পরিষদের সকল কার্যক্রম স্বাভাবিকভাবে চলছে। তবে তার করা মামলা নিয়ে প্রথম প্রথম পুলিশের যে তৎপরতা ছিল, সেটি এখন আর নেই বলে জানান তিনি।

বিশিষ্টজনরা বলছেন, তাণ্ডবে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হলে, আবারও এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি হবে। সেজন্য দ্রুত মামলাগুলোর তদন্ত শেষ করে দোষীদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান তারা।

জেলা সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের আহ্বায়ক আব্দুন নূর বলেন, ২০১৬ সালেও এক মাদরাসাছাত্রের মৃত্যুর ঘটনায় শহরজুড়ে তাণ্ডব চালানো হয়েছিল। একই বছর নাসিরনগরে হিন্দুপল্লীতে হামলা হয়। ওই দুই ঘটনায় জড়িতদের বিচার হলে তাণ্ডবের পুনরাবৃত্তি হতো না। আলোচিত এসব ঘটনার বিচার নিয়ে আমরা শঙ্কিত। আমরা চাই দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হোক। তাহলেই আর এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটবে না।

জানতে চাইলে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অর্থ) মোল্লা মোহাম্মদ শাহীন বলেন, কয়েকটি ছাড়া বাকি সবগুলো মামলার বাদী পুলিশ। জেলা পুলিশের হাতে থাকা মামলাগুলো গুরুত্ব দিয়েই তদন্ত করা হচ্ছে। আরও অনেক আসামি গ্রেপ্তারের বাকি আছে। গ্রেপ্তার অভিযানও চলমান আছে।

মোল্লা মোহাম্মদ শাহীন আরও জানান, ‘কিছু মামলার চার্জশিট হয়তো তিন-চার মাসের মধ্যে আদালতে জমা দেওয়া হবে। তবে সবগুলোর চার্জশিট দিতে কিছুটা সময় লাগবে। সেই সময়টা কতদিন, সেটা নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না’