খুলনার ‘ভূতের বাড়িটি’ ছিল প্রথম রাজাকার ক্যাম্প

‘একজন সদস্যের আত্মহত্যার কারণে পরিবারের বাকি সদস্যরা বাড়িটি ছেড়ে অন্যত্র চলে যান। খুলনা শহরবাসীর কাছে পরিত্যক্ত এই বাড়িটি ‘ভূতের বাড়ি’ নামে পরিচিতি পায়। অনেক পরে ওই বাড়ির দক্ষিণ দিকের দোতলা ভবনটিতে আনসার বাহিনীর অফিস করা হয়। মুক্তিযুদ্ধকালে পাকিস্তানী সেনাদের সহায়তা করার জন্য জামায়াতে ইসলামী নেতা মাওলানা এ কে এম ইউসুফ একাত্তরের মে মাসে এই বাড়িতেই ৯৬ জনকে নিয়ে রাজাকার বাহিনী গড়ে তোলে। রাজাকার নামটিও তার দেওয়া। এটাই একাত্তরের প্রথম রাজাকার ক্যাম্প। পরে ১৯৭১ সালের ১ জুন জেনারেল টিক্কা খান ‘পূর্ব পাকিস্তান রাজাকার অর্ডিন্যান্স-১৯৭১’ জারি করে আনসার বাহিনীকে বিলুপ্ত করে রাজাকার বাহিনীতে রূপান্তরিত করেন। পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় রাজাকার বাহিনীর সদস্যদের পূর্ণাঙ্গ সেনাবাহিনীর সদস্যদের সমান ক্ষমতা অর্পণ করে এক অধ্যাদেশ জারি করে (নং ৪/৮/৫২/৫৩৪ পিএস-১/ক ৩৬৫৯ ডি ক)। এই রাজাকাররাই মুক্তিযুদ্ধকালে পাকিস্তানী সেনাদের সহযোগী হিসেবে হত্যা-নির্যাতন, লুটপাট, অগ্নিসংযোগের মতো মানবতাবিরোধী নানা অপরাধ করে।’

খুলনা মহানগরীর রূপসা বাস স্ট্যান্ড থেকে খান জাহান আলী সড়ক ধরে টুটপাড়া কবর খানার ঠিক আগে আনসার ক্যাম্প। সেই আনসার ক্যাম্পের একটি ফলকের লেখা এটি। যেটি ২০১৫ সালের ২৯ অক্টোবর ‘১৯৭১: গণহত্যা-নির্যাতন আর্কাইভ ও জাদুঘর’র পক্ষে উদ্বোধন করেন প্রফেসর ড. মুনতাসীর মামুন।

শুধু খুলনা নয়, গোটা বাঙালি জাতির কাছে দুঃসহ স্মৃতির স্মারক এটি। সংরক্ষণের অভাবে সেটি আজ ধ্বংসের মুখে। নগরবাসী বলছে, দেশের প্রথম রাজাকার ক্যাম্পটি সংরক্ষণ করা হোক।

জানা গেছে, মুক্তিযুদ্ধকালে পাকিস্তানি সেনাদের সহায়তার জন্য জামায়াত নেতা মওলানা এ কে এম ইউসুফ একাত্তরের মে মাসে এই বাড়িতে ৯৬ জন জামায়াতের ক্যাডার নিয়ে রাজাকার বাহিনী গড়ে তোলেন। প্রথম পর্যায়ে এই বাহিনী ছিল শান্তি কমিটির নেতৃত্বাধীন। পরে ১ জুন জেনারেল টিক্কা খান “পূর্ব পাকিস্তান রাজাকার অর্ডিন্যান্স ৭১ জারি করে আনসার বাহিনীকে রাজাকার বাহিনীতে রূপান্তরিত করেন। এরপরেও খুলনা শহরের রাজাকারদের সদর দফতর ছিল এই ‘ভূতের বাড়ি’।

‘১৯৭১: ভূতের বাড়ি এবং কিছু কষ্টের স্মৃতি’ এমন এক শিরোনামে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লেখেন তৎকালীন ছাত্রলীগ নেতা ও মুক্তিযুদ্ধের ৫ম বাহিনীর সদস্য সৈয়দ মনোয়ার আলী। তিনি সেখানে লিখেছেন, ‘১ আগস্ট দিনটি ছিল আমাদের জন্য ‘গ্লুমি সানডে’। প্রকৃতিতে আলো বাতাসের অভাব ছিল না, তবু মনটা ভার হয়ে ছিল। আমি ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলাম। অফিস এবং বাড়ি, বাড়ি এবং অফিস- কোথাও একবিন্দু স্বস্তি নেই, প্রতিক্ষণ মত্যু ভয় জগদ্দল পাথরের মত বুকের ওপর চেপে বসে আছে। কী জানি আমার বোধহয় স্বাধীনতা দেখা হবে না! ১ আগস্ট কেন জানি অস্বস্তি চরমে উঠল, যা হয় হবে ভেবে পথে বেরিয়ে পড়লাম। পিটিআই মোড়ে দাঁড়িয়ে ভাবছিলাম কোন দিকে যাবো। একটা কৌতুহল ছিল, ভূতের বাড়ি রাজাকার ক্যাম্পের দিকে রওনা দিলাম। খুলনা জামায়াতের নেতা মওলানা ইউসুফ এখানেই প্রথম কুখ্যাত রাজাকার বাহিনীর গোড়াপত্তন করেন।

বাবার কাছে এই ক্যাম্পে ট্রেনিং নেওয়ার জন্য আমাদের পাঠানোর নসিহত করেছিল জামায়াত ও মুসলিম লীগের কিছু নেতা। সে সময় পথের ধারে, যেখানে এখন ব্যারাক টাইপের বিশাল বিল্ডিং, সেখানে খোলা মাঠে রাজাকার ট্রেনিং হচ্ছিল। ট্রেনিং পর্যবেক্ষণ করছিলেন মওলানা ইউসুফ ও কমার্স কলেজের অধ্যাপক হারুনার রশীদ। তারা দুজনেই আমার পরিচিত, আমি হারুন স্যারের ছাত্রও বটে। কিছুলোক পথের পাশে দাঁড়িয়ে রাজাকারদের কুচকাওয়াজ দেখছিল, আমি তাদের পেছনে দাঁড়ালাম। তবে বেশিক্ষণ দাঁড়াতে সাহস হলো না।

আড়াই ঘণ্টা পর বাড়ি ফিরে দেখি বাবা নেই। বাবা পাশের বাড়িতে গিয়েছিলেন কয়েকজন কলিগের সঙ্গে। কথা বলতে, তিষ্ঠোতে পারেননি, ঘরে ফিরেছিলেন তীব্র ক্ষোভ নিয়ে এবং কারো সঙ্গে কথা না বলে কোদাল নিয়ে তার শখের বাগানে চলে গিয়েছিলেন। আমার ছোটো ভাই মাসুক শেষবারের মত বাবাকে দেখেছিল মাটিতে কয়েকটা কোপ দিয়ে সেজদার ভঙ্গিতে লুটিয়ে পড়তে। ভাল মানুষটা মুহূর্তে নেই হয়ে গেলেন। সারা বাড়ি শোকে আচ্ছন্ন, আত্মীয় স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশী অনেকেই এসেছেন। পরিস্থিতির কারণে দ্রুততার সঙ্গে বাদ জোহর বাবার জানাজা হলো এবং তুমুল বৃষ্টির মধ্যে টুটপাড়া গোরস্তানে তার দাফন সম্পন্ন হলো।

বাবা হয়তো নিজের জীবন দিয়ে আমাদের বাঁচিয়ে গেলেন। বাবাকে কবর দিয়ে ফিরে এলাম। শামিম বলল— ভাই, আজ দুপুরে ইসলামী ছাত্র সংঘের এক নেতা আমাদের বাড়িটা দেখিয়ে এক অচেনা লোককে কী যেন বলছিল। পরিস্থিতি আমাদের সতর্ক হতে শিক্ষা দিয়েছিল। বললাম— রাতে বোধ হয় কারো বাড়িতে থাকা ঠিক হবে না। সে রাতে কয়েকটা বাড়িতে রেড হলো, এসব ছেলেরা ২৬ মার্চ রাস্তায় ব্যারিকেড দেওয়ার কাজে অংশ নিয়েছিল। হানাদাররা কাউকে বাড়িতে পায়নি। বাবার মৃত্যুতে শোকাভিভূত ভাই বোনদের ফেলে আমি বাড়ি ছাড়তে পারিনি। সৌভাগ্য আমাদের বাড়িটা সে রাতে রেড হয়নি।

পরদিন আমরা ঘুম থেকে উঠলাম গভীর বিষণ্নতা নিয়ে। বিষণ্নতা আরও গভীর হলো, আলুথালু বেশে হাউমাউ করে কাঁদতে কাঁদতে ছুটে এলেন মেজ খাল্লাম্মা। গতরাতে আর্মি আর রাজাকাররা শামিমকে (আমার খালাতো ভাই) ধরতে এসেছিল, তাকে না পেয়ে সারা বাড়ি তছনছ করে কাজলকে ধরে নিয়ে গেছে। কাজল ক্লাস নাইনে পড়ত, খুবই সাদাসিধে ছেলে। বোঝা গেল বিপদ কখনো একা আসে না। রায়হান মামা আগাখানি শিল্প গ্রুপের কর্মকর্তা ছিলেন। তিনি বিহারী কমুনিটির নেতা প্রেস মালিক ওয়ার্সী সাহেবকে সঙ্গে নিয়ে খুলনার সবগুলো রাজাকার ক্যাম্প তন্ন তন্ন করে খুঁজলেন। কাজলকে কোথাও পাওয়া গেলো না। মজিদ মামা ইউনাইটেড ব্যাংকের ম্যানেজার ছিলেন। তার অনুরোধে ব্যাংকের ভাইস চেয়ারম্যান সার্কিট হাউজ আর্মি ক্যাম্পে খোঁজ নিয়ে জানালেন গতরাতে যাদের ধরা হয়েছিল তারা মিসক্রিয়েন্ট, রাতেই গল্লামারিতে তাদের এক্সিকিউট করা হয়েছে। তবে গভীর রাতে একটা ভিন্ন খবর পাওয়া গেল, কাজল ভূতের বাড়ি রাজাকার ক্যাম্পে আটকা পড়ে আছে।

পরদিন মামারা যখন দ্বিতীয়বারের মত ভূতের বাড়ি থেকে হতাশ হয়ে ফিরছিলেন, পাশ থেকে এক রাজাকার ফিসফিস করে বলল- কাজল দোতলার ঘরে লুকিয়ে আছে, আপনারা টাকা সাধেন, নইলে আজ রাতে তাকে আর বাঁচানো যাবে না। আপনারা কমান্ডারকে বলেন তাকে দোতালার জানালায় দেখেছেন। এরপর অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে সাত শত টাকা দিয়ে কাজলকে আধমরা অবস্থায় ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়। তার দুর্ভাগ্য, সে আমাদের সঙ্গে বাবাকে মাটি দিতে গিয়েছিল, কিন্তু হাতের পেছনে লেগে থাকা কাদামাটি ভাল করে পরিষ্কার করেনি। এটা নাকি ক্রলিংয়ের আলামত। তার অস্ত্র ও সঙ্গীরা কোথায় জানার জন্য তাকে অমানষিক নির্যাতন করা হয়। কিন্তু কাজলের কাছে এই ধরনের কোনো তথ্য ছিল না, সে কিছুই বলতে পারেনি। তথাপি হত্যার জন্য তাকেও আটকে রাখা হয়। কাজলের সৌভাগ্য তার স্কুলের এক বন্ধু এখানে রাজাকার ছিল। কাজল তাকে ডাক দিলে সে বিষ্মিত হয়, বলে আমিন তুই এখানে, এই অবস্থা! তুই কি মুক্তি?

ঘটনা শুনে সে কাজলকে দোতলায় এক অন্ধকারে ঘরে লুকিয়ে রাখে, বলে যত কষ্টই হোক বেরোবি না, কোনো শব্দও করবি না। রাতে মাইকে বন্দিদের গেটের কাছে অপেক্ষমাণ কালো কাভার্ডভ্যানে ওঠার নির্দেশ দিয়ে বলা হয় তাদের সবাইকে এখন বাড়িতে পৌঁছে দেওয়া হবে। কাজল দ্বিধায় পড়ে যায়। কিন্তু তার ক্লাসফ্রেন্ড দ্রুত এসে বলে— খবরদার বেরোবি না! যারা গাড়িতে উঠবে কেউ বাড়িতে পৌঁছাবে না, ওদের মেরে ফেলার জন্য গল্লামারী ব্রিজে নিয়ে যাওয়া হবে, সে পকেট থেকে দুটো রুটি বের করে কাজলের হাতে দিয়ে বলল আমি যেভাবে হোক তোর বাড়িতে খবর পৌঁছাব, তারা তোকে ছাড়িয়ে নেবে, এভাবে অনেকে ছাড়া পেয়েছে। কাজল ততক্ষণে অন্ধকার ঘরে ভয় পেতে শুরু করেছিল, বলল সারা রাত একা কীভাবে থাকবো?

এটা তো ভূতের বাড়ি! —যদি বাঁচতে চাস থাকতে হবে, কোনো শব্দ করা যাবে না। শব্দ করলে ওরা দলবল নিয়ে চলে আসবে, নইলে সহসা কেউ এদিকটা মাড়ায় না— ওই যে বললি ভূতের বাড়ি! ভূতের চেয়ে মানুষ এখন বেশি ভয়ংকর।’

vuter bari khulnaইতিহাসের পাতায় ভূতের বাড়ি
শোনা যায় বাড়িটি থেকে এখনো রাতে নারী কণ্ঠের খিলখিল হাসির শব্দ শুনতে পান অনেকে। আবার কখনো অশরীরী ছায়ামূর্তিও দেখেছেন বলে অনেকের দাবি। খুলনার টুটপাড়া কবর খানার গা ঘেঁষে এ বড়িটি হওয়ায় মানুষের কৌতুহলও কম নয়। দিনের আলোতেও যেখানে গেলে আজও গা ছমছম করে।

এ শতকের প্রথমার্ধ্বে বাড়িটি নির্মিত হয়েছিল বলে জানা যায়। বাড়িটি নির্মাণ করেন দীননাথ সিং নামের এক ব্যক্তি। এই দীননাথ ছিলেন খুলনার কুখ্যাত নীলকর রেণীর সহযোগী। পরে বাড়িটি নানা কারণে ‘ভূতের বাড়ি’ বলে পরিচিত পায়।

এ বিষয়ে মীর আমীর আলী’র ‘খুলনা শহরের ইতিকথা’ প্রথম সংস্করণের ৩০ এবং ৩১ নম্বর পৃষ্ঠায় তিনি লিখেছেন, “বাবু দীননাথ সিংহ শখ করে নিভৃত ওই স্থানটিতে বাসা বাঁধেন। তখন স্থানটির চতুর্দিক ছিল বসতিহীন, কর্দমাক্ত। একবার এক রমণী কি কারণে যেন ওই বাড়িতে উদ্বন্ধনে মৃত্যুবরণ করেন। বস্তুতঃ বাড়ির খড়খড়িতে ধাক্কা মারা যত্রতত্র যখন তখন ঢিল ছোড়া-বাড়ি তৈরির প্রথম থেকেই ছিল। ওই মৃত্যুর পর সিং মহাশয়েরা আর সে বাড়িতে থাকতেন না। তাদের একজন মুসলিম গোমস্তা তারপর থেকে মাঝে মাঝে গিয়ে দেখাশুনা করতেন। পাকিস্তান হওয়ার পর পশ্চিমবঙ্গ থেকে জনৈক মুসলমান এসে ওই বাড়িতে ওঠেন। তথায় তার প্রথম স্ত্রীর ঘরের এক ছেলে হঠাৎ একদিন গুলিবিদ্ধ হয়ে প্রাণ হারায়। অতঃপর মোক্তার সাহেবও এখান থেকে পাত গুটান। তারপর ওই খালি বাড়িতে ডা. গোলাম জব্বার সাহেবের এক চাকরকে কে বা কারা গুলি করে সিঁড়ির গোড়ায় ফেলে রাখে। এভাবে রাতারাতি বাড়িটি ‘ভূতের বাড়ি’ নামে পরিচিত হয়ে ওঠে।

নির্জন এলাকা, পাশে কবরখানা-ভূতের একেবারে আদর্শ পরিবেশ। শোনা যায় পরেও যারা এ বাড়িতে এসেছেন তাদেরও কোনো না কোন অঘটন ঘটেছে। তবে এখন ‘ভূতের বাড়ি’নাম নিয়ে বাড়িটি আছে তবে ভূত নেই। খুলনা মজিদ মেমোরিয়াল সিটি কলেজ বর্তমান রিকিউজিসন করা বাড়িতে যাওয়ার আগে এখানে কিছুদিন ছিল। পরে সেখানে স্থাপন করা হয় আনসার ক্যাম্প।”

অন্য এক ইতিহাসে জানা যায়, মুর্শিদকুলি খাঁর অধীনস্ত জমিদার ছিলেন রঘুনন্দন। তার একজন প্রিয় কর্মচারী ছিলেন দয়ারাম। যিনি ১৭১৪ সালে মাগুরা জেলার মহম্মদপুরের রাজা সীতারাম রায়কে পরাজিত করেন। এসময় অনেক অর্থ ও ভূসম্পত্তি দখলও করেন। যশোর ও খুলনা অঞ্চলে তার অনেক জমিও ছিল। পরবর্তীতে তিনি ‘রাজা দয়ারাম’নামে পরিচিতি লাভ করেন। এই রাজা দয়ারামই নাটোরের দীঘাপাতিয়া রাজপরিবারের প্রতিষ্ঠাতা। রাজা দয়ারামের শীলা নামে এক ভাগিনি ছিল । তার বোন এবং ভগ্নিপতি এক রাতে একইসঙ্গে কলেরায় আক্রান্ত হয়ে মারা যান। বাবা-মাকে হারিয়ে শীলা আশ্রয় পান মামা রাজা দয়ারামের কোলে।

একদিন রাজবাড়ির মঞ্চে যাত্রা হচ্ছিল। ওই যাত্রায় রাজার তহসিলদার অমূল্য ধনের পুত্র নিশিকান্তের অভিনয়ে মুগ্ধ হন শীলা। একে অপরের প্রতি দুর্বল হয়ে পড়ে এবং একপর্যায়ে গোপনে তাদের দেখা-সাক্ষাৎ হতে থাকে। একসময় তারা সিদ্ধান্ত নেয় পালানোর। শীলা পালাতে গিয়ে রাজবাড়ির নৈশপ্রহরীর হাতে ধরা পড়েন । বিষয়টি জানাজানি হওয়ার আগেই দ্রুত নিধুরাম নামের এক যুবকের সঙ্গে তার বিয়ে দেওয়া হয়। গোপনে তাদের পাঠিয়ে দেওয়া হয় খুলনায় এবং নিধুরামকে দায়িত্ব দেওয়া হয় খুলনা অঞ্চলের খাজনা আদায়ের কাজ। শীলা ও নিধুরাম খুলনায় এসে ওই পরিত্যক্ত ভূতের বাড়িতেই ওঠেন।

বাড়িটি নির্মাণ করেছিলেন রাজা দয়ারাম। খাজনা আদায়ের সময় রাজার লোকজন এ ভবনে থাকত। যদিও কাজ শেষে তারা নাটোর ফিরে যেত। তখন বাড়িটি তালাবদ্ধ হয়ে থাকত। কিন্তু শীলা ও নিধুরামকে পাঠানো হয়েছিল স্থায়ীভাবে ওই বাড়িতে থাকার জন্য। কিন্তু শীলা যে নিশিকান্তকে তখনও ভালোবাসেন তা নিধুরাম বুঝতেন। এজন্য তার দেহ তিনি নিধুরামকে স্পর্শ করতে দেননি। এ নিয়ে তাদের মধ্যে দাম্পত্য কলহ বাড়তে থাকে। এক রাতে শীলা আত্মহত্যা করেন। শীলার পরিণতি দেখে নিধুরামও আত্মহত্যা করেন। সকালে ঘরে দুজনের লাশ দেখে চাকর-বাকরও ভয় পেয়ে পালিয়ে যায়। ভবনটি পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে থাকে দীর্ঘদিন।

তবে এ এলাকার প্রবীণ অনেকেরই ধারণা, এগুলো সব নাকি ভূতের কারসাজি। পরিত্যক্ত ওই বাড়িটি ষাটের দশকে খুলনা জেলা আনসার কার্যালয় করা হয়। তবে বর্তমানে সেই ভবনটি আগাছা, বন-জঞ্জলে ভরে গেছে। রক্ষণাবেক্ষণ করা হয় না।

বীরশ্রেষ্ঠ মো. রুহুল আমিন পাবলিক লাইব্রেরির সাধারণ সম্পাদক এবং ইতিহাসবিদ এএইচএম জামাল উদ্দীন জানান, খুলনার ওই ভুতের বাড়ি নিয়ে অনেক শ্রুতিমধুর গল্প রয়েছে। তবে বই-পত্র ঘেটে দু’একটি গ্রহণযোগ্য ইতিহাস পাওয়া যায়। যার মধ্যে অধিক গ্রহণযোগ্য মীর আমীর আলী’র ‘খুলনা শহরের ইতিকথা’ বইয়ের লেখা। যে বাড়িটি নিয়ে এতো কথা সেই বাড়ি সংরক্ষণ করা প্রয়োজন। তা না হলে সময়ের পরিবর্তনে এ ইতিহাসটুকুও হারিয়ে যাবে।

একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি খুলনার আহ্বায়ক ডা. বাহারুল আলম বলেন, অনেক স্মৃতি, আর কলঙ্কের সাক্ষী এই ভূতের বাড়ি। সরকারের কাছে জোর দাবি জানাই এই বাড়িটি সংরক্ষণ করে এখানে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর করা হোক।