কনকনে শীতেও সারাদিন ঠান্ডা পানিতে কাজ করেন তারা

দেশের সর্ব উত্তরের জেলা পঞ্চগড়ে তাপমাত্রা ওঠানামা করায় শীতের তীব্রতা বেড়েই চলছে। রাত থেকে সকাল পর্যন্ত উত্তর দিক থেকে বয়ে আসা হিমালয়ের হিম বাতাস ও ঘন কুয়াশায় ঢেকে থাকে পুরো জেলা। শীতের দাপটে সব কিছু স্থবির হয়ে পড়লেও জীবিকার তাগিদে বসে থাকতে পারেন না জেলার সীমান্তবর্তী উপজেলা তেঁতুলিয়ার পাথর শ্রমিকরা।

দুবেলা দুমুঠো খাবার যোগাতে কাকডাকা ভোরে কনকনে শীতের মধ্যেও ঘাড়ে ঢাকি-কোদাল, আর ট্রাক্টরের হাওয়া ভর্তি টিউব নিয়ে ছুটে যান বরফ গলা নদী মহানন্দায়। হিমালয় থেকে বয়ে আসা মহানন্দা নদীর বরফ গলা ঠান্ডা জলরাশিই তাদের জীবিকার উৎস। জীবিকার তাগিদে করতোয়া ও ডাহুক নদীতেও ছুটে যান পাথর শ্রমিকরা।

সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত মহানন্দার এই বরফশীতল পানির নিচ থেকে শ্রমিকরা সংগ্রহ করেন নুড়ি পাথর। এরপর সেই পাথর বিক্রি করে যে টাকা পান তা দিয়ে কোনো রকমে জীবিকা নির্বাহ করেন তেঁতুলিয়ায় প্রায় ৫০ হাজার পাথর শ্রমিক।

মঙ্গলবার (১৫ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে তেঁতুলিয়ার মহানন্দা নদীতে গিয়ে দেখা যায়, শীত ও কুয়াশার কারণে নদীতে নামার অপেক্ষা করছেন অনেকেই। কেউ কেউ আবার শীত-কুয়াশা উপেক্ষা করে জীবিকার তাগিদে ঠান্ডা পানিতে নেমে পাথর উত্তোলন শুরু করেছেন।

সরেজমিনে দেখা যায়, দেশের শেষ সীমান্ত বাংলাবান্ধা থেকে তেঁতুলিয়া পর্যন্ত ২৫ কিলোমিটার অংশে হিমালয় পর্বত থেকে বরফ গলা পানি বাংলাদেশ ও ভারতকে ভাগ করে মহানন্দা প্রবাহিত হয়েছে। এর মধ্যে নদীপাড়ের কয়েকটি গ্রামের মানুষের জীবন-জীবিকা নদী কেন্দ্রিক। শুধু নদী পাড়ের বাসিন্দারাই নন, তেঁতুলিয়া উপজেলার সাতটি ইউনিয়নসহ জেলার বিভিন্ন এলাকার মানুষ ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে নদীর গভীর অংশ থেকে নুড়ি পাথর সংগ্রহ করেন। সেগুলো পাড়ে স্তূপ করেন।

সেই স্তূপ করা পাথর নারী ও শিশুরা আকার অনুযায়ী বাছাই করেন। সন্ধ্যায় মহাজনের কাছ থেকে মজুরি নিয়ে বাড়ি ফেরেন তারা। এতে একজন পুরুষ শ্রমিক দিনে আয় করেন সর্বোচ্চ ৪০০ থেকে ৭০০ টাকা। সারা বছরই চলে এ পাথর উত্তোলনের কাজ। প্রচণ্ড শীতেও অভাব ও ক্ষুধার জ্বালায় তাদের নামতে হয় বরফ গলা পানিতে। তবে আগের মতো মহানন্দা নদীতে পাথর না থাকায় শ্রমিকদের আয় কমে গেছে। যে পাথর তারা পাচ্ছেন তা আকারে অনেক ছোট এবং দামও কম।

শ্রমিকরা জানান, বর্ষাকালে নদীতে পানি থাকায় নামতে পারেন না তারা। গ্রীষ্মকালে প্রখর রোদেও ব্যাহত হয় তাদের কাজ। আবার কনকনে শীতে তাদের কপালে নেমে আসে চরম দুর্ভোগ। কনকনে শীতে তারা তেমন কাজ না পাওয়ায় জীবিকার তাগিয়ে নদীর ঠান্ডা পানিতে কাজ করছেন। এভাবেই চলছে তাদের জীবন।

স্থানীয়রা জানান, পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়া উপজেলা হিমালয়ের অনেক কাছাকাছি হওয়ায় এ অঞ্চলে শীত মৌসুমে শীতের দাপট একটু বেশি। মৌসুমের প্রায় বেশীর ভাগ দিনই সর্বনিম্ন তাপমাত্রা বিরাজ করে এখানে। কনকনে শীত অনুভূত হওয়ার কারণে এখানে তীব্র শীতে পাথর শ্রমিকরা একটু বেশি বিপাকে থাকেন। অধিকাংশরাই কর্মহীন হয়ে পড়েন। আবার অনেকেই জীবিকার তাগিদে ছুটে চলেন নুড়ি পাথরের সন্ধানে মহানন্দার বরফ গলা পানিতে।

এ বিষয়ে কথা হয় মহানন্দা পানিতে পাথর উত্তোলনকারী শ্রমিক রবিউল ইসলামের সঙ্গে। তিনি বলেন, নদীর পানি প্রচুর ঠান্ডা। শীতের কারণে মানুষ যখন ঘরে বসে আরাম কিংবা গরম কাপড় পড়ে ঘুরে বেড়ায় তখন আমরা হাজার হাজার পাথর শ্রমিক জীবিকার তাগিদে ঠান্ডা পানিতে নেমে সারাদিন কাজ করি। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত যেসব পাথর সংগ্রহ করি, সেসব সন্ধ্যায় বিক্রি করে যা পাই তা দিয়েই সংসার চলে।

একই কথা জানান আবু হাসান নামে আরেক শ্রমিক। তিনি বলেন, আমরা গরিব মানুষ, তাই যতোই শীত করুক কাজে বের হতে হয়। আমরা শুনেছি জেলেদের যখন মাছ ধরা বন্ধ হয়, বন্যাকবলিত এলাকার কর্মজীবী মানুষেরা যখন কাজ পায় না, তখন সরকার তাদের ত্রাণ ও প্রণোদনা দিয়ে সহযোগিতা করে। কিন্তু আমরা মহানন্দার ৫০ হাজার শ্রমিক বর্ষাকালে ৩০ মাস বেকার থাকি। কনকনে শীতেও তেমন কাজ করতে পারি না। অথচ আমাদের কপালে একটা কম্বলও জোটে না। আমরা কি সহযোগিতা পাওয়ার যোগ্য না?

এ বিষয়ে কথা হয় পাথর ব্যবসায়ী জাহিরুল ইসলামের সঙ্গে। তিনি বলেন, শ্রমিকরা কনকনে শীতে তেমন পাথর উত্তোলন করতে পারছেন না। তারপরও সারাদিন পাথর উত্তোলন করে যা পান তা দিয়ে তারা সংসার চালান। আমরা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী। তাদের কাছ থেকে পাথর ক্রয় করে বিক্রি করে যে লাভ হয় তা দিয়েই চলি। আমরা যতটুকু পারি চেষ্টা করি শ্রমিকদের সহযোগিতা করার। তবে সরকার যদি কোনো সহযোগিতা করতো তাহলে তারা অনেক উপকৃত হতো।

তেঁতুলিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সোহাগ চন্দ্র সাহা বলেন, সীমান্তবর্তী এ উপজেলায় তেমন কোনো শিল্প কারখানা গড়ে না ওঠায় এখানে কর্মসংস্থানের অভাব। এখানকার অনেক মানুষ মহানন্দা, করতোয়া ও ডাহুক নদীতে পাথর উত্তোলন করে জীবিকা নির্বাহ করেন। প্রাকৃতিক উৎস থেকে যে পাথর ভেসে আসে সেই পাথর উত্তোলন করে তারা চলেন। আমরা উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময়ে এসব শ্রমিকদের সাহায্য-সহযোগিতা দিয়ে পাশে থাকার চেষ্টা করেছি।