এহন আমার কীভাবে চলমু

মেঘনা নদীতে ঢাকা থেকে ছেড়ে আসা যাত্রীবাহী লঞ্চ তাসরিফ-২ এর ধাক্কায় মাছ ধরার ট্রলারডুবির দুই দিন পার হলেও ভোলার দৌলতখান উপজেলার চরপাতা ইউনিয়নের নিখোঁজ এক জেলের সন্ধান মেলেনি। এ ঘটনায় দুই জেলের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। নিখোঁজ ও নিহত জেলেদের পরিবারে চলছে মাতম।

শুক্রবার (২৫ ফেব্রুয়ারি) সরেজমিনে ভোলার দৌলতখান উপজেলার চরপাতা ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের বেড়িবাঁধ এলাকার নিখোঁজ জেলে মো.মমিন (২৫), একই গ্রামের নিহত মো. এরশাদ (৩৫) এবং ৪ নম্বর ওয়ার্ডের মো. আলী আকবরের (৩৪) বাড়িতে গিয়ে স্বজনদের কান্না আর আহাজারি করতে দেখা গেছে।

নিখোঁজ জেলে মমিনের ভাই আজগর মাঝি বলেন, ‘গত বুধবার (২২ ফেব্রুয়ারি) দুপুরেও এক সঙ্গে বাড়ি থেকে বের হয়ে ঘাটে গেছিলাম। মমিন সব সময় হাসিখুশি থাকত। মমিনের ছোট দুইটা মেয়ে আছে। তাগো কী হইব, তাগো ভবিষ্যত কী? মমিনের উপার্জনে পুরো পরিবারটা চলত, এখন কী হইব?’

নিহত আলী আকবরের বাড়িতে গিয়ে কথা হয় তার স্ত্রী বিবি শাহিনার সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘আমার স্বামী যাওয়ার সময় ছোট মাইয়াডার হাতে ১০টা টাকা দিয়া রাস্তায় পোলাপাইনের লগে ঝগড়া না করতে কইছে। নদীর তনে আইয়া নতুন জুতা কিন্না দিব। এহন আমি এমন পর্যায় আছি সামনে ১০ দিন পোলা মাইয়া লইয়া দুইডা ভাত খামু ওই ব্যবস্থাও নাই। আমার স্বামী দিন মজুরির কাজ করত, আমি পোলাপাইন লইয়া খাইছি। এহন আমার স্বামী নাই। আমরা কীভাবে চলমু, কীভাবে খামু আমার ছয় বছরের মাইয়া আর চার বছরের সন্তান লইয়া? আমার ভাতের চাবি উইরা গেছে।’

নিহত এরশাদের বাড়িতে গেলে কথা হয় তার বোন মরিয়ম বিবির সঙ্গে। তিনি বলেন, আমার ভাই জেলের কাজ কইরা মা, বাপ, বউ, পোলাইন লইয়া কোনো রকম দিন চলত। গেছে বাইসায় ঘর ঠিক করার লাইগা দুই তিনডা সমিতি থেকে লোনের টাকা দিয়া ঘর ঠিক করছে। হেই ঘরে ভাই আর থাকতে পারল না। ঘর ও আছে সমিতির লোন ও আছে আমার ভাই তো নাই। ভাইয়ের দুই মেয়ে আর এক ছেলে আছে। এহন এই পোলাপাইনডি কই যাইব, কার ধারে (কাছে) যাইব? মাইয়া দুইডা ডাংগর (বড়) হইতাছে, ওগো বিয়া দেওন লাগব।’

ভোলা সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন জীবিত ফিরে আসা মো. সোহেল মাঝি ঘটনার বিবরণ দিয়ে বলেন, গত বুধবার দুপুরে চরপাতা কাজিরহাট নতুন মাছঘাট থেকে আব্দুর রহমান মাঝির ট্রলার নিয়ে আমরা ৯ জেলে মেঘনায় মাছ ধরতে যাই। সন্ধ্যা থেকে এক খেওয়া মাছ ধরার পর রাত দেড়টার দিকে কুয়াশার ভেতরে উপজেলার চৌকিঘাট এলাকায় মাঝ নদীতে জাল ফেলে একজন জালের কাছি ধরে ছিল, একজন ট্রলারের সামনে আর বড় মাঝি ট্রলার চালাচ্ছিল। আর আমরা বাকি ছয় জেলে ট্রলারের কেবিনে ভিড়ছিলাম। হঠাৎ করে রাত ২টার দিকে ঢাকা থেকে হাতিয়াগামী লঞ্চ এমভি তাসরিফ-২ জোরে ট্রলারের মাঝখানে ধাক্কা দেয়।

এ সময় আমরা পানির নিচে চলে যেতে থাকি। তার পরপরই ওই লঞ্চের পেছন দিয়ে একই গতিতে আরও একটি লঞ্চ আসলে তার ঢেউয়ে আমাদের ট্রলার আরও নিচের দিকে যেতে থাকে। একপর্যায়ে কেবিনের সবাই বের হয়। কুয়াশার জন্য চারপাশে কিছু না দেখতে পেয়ে একটা লাইট পেয়ে তার আলো দিয়ে ডাক চিৎকার দিলে দূর থেকে অন্য একটি মাছ ধরার ট্রলার এসে আমাদের উদ্ধার করে। তারপর কী হয়েছে আমি কিছু বলতে পারি না। ডাক্তার বলেছে আমার মেরুদণ্ড ভেঙে গেছে।

চরপাতা কাজিরহাট নতুন মাছঘাটের রাছেল মাঝি ও সেকান্দার মাঝি বলেন, মেঘনা নদীতে ঢাকাগামী প্রায় সব লঞ্চ তাদের রুট না মেনে জেলেদের ট্রলার ও জালের ওপর দিয়ে যায়। জেলেদের লাখ লাখ টাকার সম্পদ নষ্ট করে দেয় তারা। এমনকি কুয়াশার সময় কোনো লাইট ও হর্ন না বাজিয়ে অধিক গতিতে চলে। এই লঞ্চের বেপরোয়া গতির জন্য একাধিক ছোট বড় ট্রলার ও জাল নষ্ট হয়ে গেছে।

দৌলতখান উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোহাম্মদ তারেক হাওলাদার জানান, বিষয়টি জানতে পেরে নিখোঁজ জেলেদের উদ্ধারের জন্য কোস্টগার্ড, ফায়ার সার্ভিস ও পুলিশ সদস্যরা যৌথভাবে উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করে মেঘনা নদী থেকে দুর্ঘটনাকবলিত ট্রলার ও নিখোঁজ তিন জেলের মধ্যে দুই জেলের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। অপর এক জেলের সন্ধানে দ্বিতীয় দিনের মতো উদ্ধার অভিযানে নেমেছেন কোস্টগার্ড সদস্যরা।

তিনি আরও জানান, দুর্ঘটনার কবলে পড়ে নিহত, নিখোঁজ ও গুরুতর আহত জেলেদের উপজেলা প্রশাসনের পক্ষে সহযোগিতা করা হবে।

দৌলতখান থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) বজলার রহমান জানান, মেঘনায় লঞ্চের ধাক্কায় ট্রলারডুবির ঘটনায় এমভি তাসরিফ-২ লঞ্চের চালক ও শুকানিসহ সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে
ট্রলার মালিক আবদুর রহমান বাদী হয়ে হত্যা মামলা করেছেন। মামলার ভিত্তিতে তদন্ত চলছে। তদন্ত সাপেক্ষে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।