‘আগের মতো ব্যবসা নাই শ্যামবাজারে’

ঢাকার অন্যতম পুরাতন বাজার শ্যামবাজার। ব্রিটিশ আমল থেকে ঢাকাবাসীর বিভিন্ন নিত্যপণ্যের যোগান দিয়ে আসা বাজারটি বর্তমানে ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হচ্ছে।

সপ্তাহের সাত দিনই কর্মযজ্ঞ চলে এখানে। প্রতিদিন ভোর থেকে রাত আটটা পর্যন্ত লেনদেন হলেও সাধারণত ফজরের পর থেকে সকাল ১১টা পর্যন্ত বেশি মানুষের সমাগম থাকে বিখ্যাত বাজারটিতে।

এক সময় সারাদেশে থেকে পাইকাররা এসে ভিড় করায় ব্যবসা জমজমাট থাকলেও এখন আগের মতো ব্যবসা নেই বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। যারা আসেন তারা ঢাকাসহ আশপাশের ২-৪টি জেলার। তবে চাহিদাও কমলেও পণ্য আমদানি কমেনি।

শুক্রবার (১ এপ্রিল) শ্যামবাজারে সরেজমিনে ঘুরে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলেন এই প্রতিবেদক।

মেসার্স রাজ ভাণ্ডার ট্রেডিংয়ের মালিক হাজী মো. মাজেদ বলেন, ‘এখানে চাহিদার চেয়ে বেশি পণ্য আসে। উদাহরণস্বরূপ চাহিদা ৩ গাড়ি থাকলে আসছে নয় গাড়ি।

বাজারে দেখা যায়, রাস্তার দুই পাশে বিস্তৃত আড়ত। ট্রাক থেকে পণ্য উঠানামায় ব্যস্ত সময় পার করছেন শ্রমিকরা। কারও দম ফেলানোর ফুরসত নেই। পাইকাররাও ব্যস্ত। তারা পণ্য বুঝে নেওয়ার কাজ করছেন।

স্মৃতি বাণিজ্যালয়ের মালিক নুরুল ইসলাম বলেন, ‘বাপ-দাদারা যেভাবে ব্যবসা করে গেছেন, সে হালে ভাটা পড়েছে। অড়তদার বেড়েছে। শহরের বিভিন্ন স্থানে গড়ে উঠেছে আড়ত। আমাদের হাতে আসা পণ্যগুলো পচনশীল। দু-এক দিনের বেশি রাখা যায় না। দেশে উৎপাদিত পণ্য, চাহিদার হালনাগাদের সঠিক কোনো পরিসংখ্যান থাকে না আমাদের কাছে। ধারণার ওপর চলে ব্যাবসা। নেই কোনো তথ্যভাণ্ডার।

বাজারটিতে আড়তের সংখ্যা ৩০০ টিরও বেশি। তবে আমাদানিকারক ২৫-৩০ জন। কেউ কেউ বলছেন এ সংখ্যা আরও বেশি। যারা একই সঙ্গে আড়তদারি ও ব্যবসা করেন। কাজ করেন আমদানিকারক ও পাইকারি ব্যবসায়ীদের ‘কমিশন এজেন্ট’হিসেবে। যারা আড়তদার সংশ্লিষ্ট আমদানিকারক এবং পাইকার ক্রেতাদের থেকে নির্ধারিত হারে কমিশন পেয়ে থাকেন।

শ্যামবাজারে ব্যবসা কমে যাওয়াসহ লোকসাসের কারণ অনুসন্ধানে ব্যবসায়ীর সঙ্গে কথা বলেন এই প্রতিবেদক। তারা জানান, প্রয়োজনের চেয়ে বেশি পণ্য আমদানিই এমন লোকসানের কারণ। পণ্য বেশি থাকায় বাজারে দাম পড়ে যায়। এছাড়াও জোগান নিয়ে ধারণার চেয়েও বেশি ঘাটতি রয়েছে। ভোক্তার চাহিদার বিষয়টি নিয়ে আমদানিকারকদের জানার তোড়জোড় কম। এমন অপরিকল্পিত আয়োজনে উৎপাদক পর্যায় থেকে কৃষকরা যেমনি ন্যায্যমূল্য পায় না, দাম কমায় মধ্যস্বত্বভোগীদের কারণে খুচরা পর্যায়েও সুফল পান না সাধারণ ভোক্তারা। তাই ব্যবসায়ীদের সঠিক তথ্য জানা প্রয়োজন। সে ‘তথ্যভান্ডার’ বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে করে দেওয়ার দাবি তাদের।

ব্যবসায়ীরা জানান, এক সময় শ্যামবাজারের পণ্যবাহী ট্রাকের জটলা রায়সাহেব বাজার ও ইংলিশ রোড ছাড়িয়ে যেত। এখন কারওয়ানবাজার, যাত্রাবাড়ী, মোহাম্মদপুর, টঙ্গী, বাইপাইল, মিরপুর, মহাখালীর মতো স্থানে পাইকারি বাজার গড়ে ওঠেছে। যার কারণে এসব বাজার থেকে অনেকে কেনাকাটা করেন। তাই চাহিদা কমেছে শ্যামবাজারে।

বাজারটি ঘুরে দেখা যায়, বুড়িগঙ্গা নদীর তীর ঘেঁসা লালকুঠি ঘাটের মোড়ে অসংখ্য আড়ত। একটু সামনে গেলেই ফরাশগঞ্জের বি কে দাশ রোড। সারি সারি আড়তের সমারোহ। থরে থরে সাজানো ভোগ্যপণ্যে। পেঁয়াজ, রসুন, আদা, শুকনো মরিচ, হলুদ, ধনে, আলু ইত্যাদি।

নদীর পাশেই সবজির আড়ত। যেখানকার বেশিরভাগই নদীপথে মুন্সিগঞ্জ ও নারায়ণগঞ্জ থেকে ট্রলারে করে লাউসহ নানা রকমের সবজি ঘাটে ভিড়ছে। ক্রেতা-বিক্রেতাদের হাঁকডাকে সরগরম পুরো বাজার এলাকা। বেচাবিক্রিও হচ্ছে অনেক।

আরেকটু সামনে এগুলেই সদরঘাট। পানের আড়ত। সব মিলিয়ে সংখ্যায় ৫০-৫৫ টির কম নয়। যদিও বাজারটির মূল ব্যবসা আদা, রসুন, পেঁয়াজ, হলুদ ও শুকনা মরিচের আড়তদারি।

ব্যবসায়ীরা জানান, শুক্রবার ছুটির দিন হওয়ায় অন্যান্য দিনের তুলনায় আজ বেচাকেনাটা একুট বেশি হচ্ছে।

রাজীব বাণিজ্য ভান্ডারের একাধিক কর্মকর্তা পণ্যর ঘাটতি নেই জানিয়ে বলেন, আমদানি বেশি থাকলে দাম কমে। বাজারটিতে এজেন্টের মাধ্যমেই ভোগ্যপণ্য আমদানি হয়ে থাকে। দেশে উৎপাদিত পণ্যের উৎপাদন, মজুত ও চাহিদার হালনাগাদ পরিসংখ্যান ইত্যাদি দিয়ে তথ্যভান্ডার করে ব্যবসায়ীদের সেটি দিতে হবে, না হলে এই ব্যবসা ঠিকপথে আসবে না। তবে আমরা বহুবার বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে একটি তথ্যভান্ডার করে দেওয়ার অনুরোধ করেছি। কাজ হয়নি।’