অবহেলায় নিশ্চিহ্ন হচ্ছে নওগাঁর বধ্যভূমি

একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে সারাদেশের মতো নওগাঁ জেলাতেও পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী বর্বরতম হামলা, অগ্নিসংযোগ, লুটতরাজ, নারী নির্যাতন ও গণহত্যার মতো বিভীষিকার সাক্ষী রেখে গেছে।

সেই সময়ে হানাদার বাহিনীর বর্বরতার চিহ্ন নওগাঁ জেলার বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। এসব স্থানে গণহত্যা চালিয়ে লাশগুলো গাদাগাদি করে পুঁতে রাখা হয়েছে। এগুলো বধ্যভূমি নামে পরিচিত। দীর্ঘদিন এসব বধ্যভূমি আবিষ্কার করে যথাযথ সংরক্ষণ করে কোনো স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা সম্ভব হয়নি। অতি সম্প্রতি এসব বধ্যভূমির তালিকা তৈরি এবং কিছু কিছু বধ্যভূমিতে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা হলেও এ বধ্যভূমিগুলো অধিকাংশই আজও অরক্ষিত, অযত্ন ও অবহেলায় নিশ্চিহ্ন। স্মৃতিফলক ও সীমানাপ্রাচীর না থাকায় সারাবছরই এসব বধ্যভূমি ও গণকবর ঝোপঝাড়ে ভরে থাকে। কিছু বধ্যভূমিতে মুক্তিযোদ্ধার পরিবার ও একুশে পরিষদের পক্ষ থেকে স্মৃতিফলক নির্মাণ করা হয়েছে। আবার যেগুলোতে স্মৃতিফলক রয়েছে সেগুলোর সঠিকভাবে রক্ষণাবেক্ষণ নেই।

একুশে পরিষদ নওগাঁ নামের একটি সামাজিক সংগঠনের উদ্যোগে জেলার ১১টি উপজেলায় খোঁজ নিয়ে এ ধরনের ৬৭টি বধ্যভূমি তথ্য সংগ্রহ করেছে। এগুলোর মধ্যে নওগাঁ সদর উপজেলায় ১৫টি, মহাদেবপুর উপজেলায় ৫টি, বদলগাছি উপজেলায় ৬টি, মান্দা উপজেলায় ৪টি, পত্নীতলা উপজেলায় ৭টি, আত্রাই উপজেলায় ১৩টি, রানীনগর উপজেলায় ৩টি, ধামইরহাট উপজেলায় ৩টি, নিয়ামতপুর উপজেলায় ২টি, সাপাহার উপজেলায় ৮টি এবং পোরশা উপজেলায় ১টি। এছাড়া আরও কয়েকটি স্থানে গণহত্যার ঘটনা ঘটেছে।

জেলার সবচেয়ে বড় গণহত্যার ঘটনাটি ঘটেছে মান্দা উপজেলার পাকুরিয়া গ্রামে। ১৯৭১ সালের ২৮ আগস্ট সকালে পাক হানাদার বাহিনী তাদের দোসর রাজাকার আলবদরদের সঙ্গে নিয়ে পাকুরিয়া গ্রাম ঘেরাও করে ওই গ্রামের বাসিন্দাদের পাকুরিয়া স্কুল মাঠে এনে সমবেত করে বেপরোয়া গুলিবর্ষণ করে। এতে ১২৮ জন শহীদ হন। পাকুরিয়ার গণহত্যায় নিহত ৭৩ জনের নাম পাওয়া গেছে। পাক হানাদার বাহিনী সেখান থেকে চলে গেলে গ্রামবাসী লাশগুলোকে একই কবরে পুঁতে রাখেন। এটি পাকুরিয়া বধ্যভূমি নামে পরিচিতি লাভ করে। পরে সেখানে শহীদদের স্মরণে একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা হয়েছে।

এই উপজেলায় অপর ৩টি বধ্যভূমির মধ্যে ১৯৭১ সালের ৬ নভেম্বর ভাঁরশো ইউনিয়নের কবুলপুর গ্রামে গুপ্তির পুকুর পাড়ে হানাদার বাহিনী ৪ জনকে গুলি করে হত্যা করে একই কবরে পুঁতে রাখে। এটি কবুলপুর গণহত্যা নামে পরিচিত।

১৯৭১ সালের মে মাসের মাঝামাঝি কোনো এক সময় রাজশাহী থেকে একদল হানাদার দেলুয়াবাড়ি-কীত্তলী গ্রামে এসে গ্রামটি ঘিরে ফেলে এবং ১৫ জনেরও বেশি মানুষকে গুলি করে হত্যা করে। পরে তাদের একটি কবরে গাদাগাদি করে পুঁতে রাখা হয়। এটি দেলুয়াবাড়ি-কিত্তলী গণহত্যা নামে অভিহিত। বিজয় অর্জনের মাত্র কয়েকদিন আগে ১৩ ডিসেম্বর বেলা ৩টায় হানাদার বাহিনী মান্দা উপজেলার মনোহরপুর গ্রামটি ঘিরে ফেলে এবং ব্রাশ ফায়ারে ১৬ জনকে হত্যা করে। পরে গ্রামবাসী সেখানে একটি গর্ত খুঁড়ে লাশগুলো মাটিচাপা দিয়ে রাখেন। এটি মনোহরপুর গণহত্যা নামে পরিচিত।

জেলার দ্বিতীয় বৃহত্তম গণহত্যা সংঘটিত হয় রানীনগর উপজেলার আতাইকুলা গ্রামে। ১৯৭১ সালের ২৫ এপ্রিল সকাল ৮টায় এই গ্রামে হানাদার বাহিনীর গুলিতে ৫২ জন মানুষের রক্তে রঞ্জিত হয়েছিল আতাইকুলা গ্রামের সবুজ চত্বর। পরে একটি গর্তে লাশগুলো পুঁতে রাখা হয়। এটি আতাইকুলা গণহত্যা হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে। এখানে একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা হয়েছে। রানীনগর উপজেলায় বড়বড়িয়া গ্রামে ১৯৭১ সালের ১৯ নভেম্বর মুক্তিযোদ্ধাদের অবস্থান টের পেয়ে হানাদার বাহিনী আক্রমণ চালিয়ে ৫ জন বীর মুক্তিযোদ্ধাসহ মোট ৭ জনকে গুলি করে নৃশংসভাবে হত্যা করে। এটি বড়বড়িয়া গণহত্যা নামে পরিচিত। এই উপজেলার অপর গণহত্যার ঘটনাটি ঘটেছিল হরিপুর রানীভবানী জঙ্গলে। জৈষ্ঠ মাসের এক শনিবারে ২০-৩০ জনের একটি পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর দল স্থানীয় রাজাকারদের সহযোগিতায় শিশুসহ ১০ জনেরও বেশি মানুষকে নির্মমভাবে গুলি করে হত্যা করে।

২৫ এপ্রিল নওগাঁ সদর উপজেলার বোয়ালিয়া ইউনিয়নের দোগাছি গ্রামের একটি পুকুরে দোগাছি, কিদিরপুর, পিরোজপুর শিমুলিয়া ইত্যাদি গ্রাম থেকে ধরে এনে মোট ৫৫ ব্যক্তিকে গুলি করে এবং রাইফেলের বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করে মাটিচাপা দিয়ে রাখে। এখানে পিকেএসএফের অর্থায়নে বেডো নামের একটি বেসরকারি সংগঠন একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করেছে। ১৯৭১ সালের ৭ নভেম্বর সদর উপজেলার পার-বোয়ালিয়া গ্রামে পাক হানাদার, বিহারি সম্প্রদায়, রাজাকার ও মিলিশিয়াদের সমন্বয়ে স্থানীয় জয়বাংলা হাট ও পার-বোয়ালিয়া গ্রাম আক্রমণ করে কমপক্ষে ১৪ জন বেসামরিক ব্যক্তিকে হত্যা করা হয়। পরে এখানে একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা হয়েছে।

মহাদেবপুর উপজেলার দেবীপুর গ্রামে ২৬ এপ্রিল সকাল ১০টায় ৯ জনকে, একই দিনে উপজেলার মহিষবাতান গ্রামে আক্রমণ চালিয়ে মোট ৩০ জনকে হত্যা করে। এদের মধ্যে ১২ জনের পরিচয় পাওয়া গেলেও ৬ গারোয়ানসহ আরও ১২ জনের পরিচয় পাওয়া যায়নি। তাদের একই কবরে মাটিচাপা দেওয়া হয়।

বদলগাছি উপজেলায় ১৯৭১ সালের ৮ নভেম্বর রোববার পাক হানাদারদের সঙ্গে সম্মুখযুদ্ধে কমপক্ষে ২ জন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন। ৭ অক্টোবর ঐতিহাসিক পাহাড়পুর এলাকায় ২ জন অজ্ঞাতনামাসহ মোট ৭ ব্যক্তিকে গুলি করে হত্যা করে পাকহানাদার বাহিনী। বদলগাছি উপজেলার মির্জাপুর এলাকায় ৯ জন মুক্তিযোদ্ধা নির্দিষ্ট গন্তব্যে যাওয়ার সময় পাক হানাদার বাহিনী তাদের আটক করে সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে গুলি করলে তাদের মধ্যে ৬ জন শহীদ হন। তাদের সেখানে গণকবর দেওয়া হয়।

পত্নীতলা উপজেলার নির্মইল ইউনিয়নের হালিমনগরে ৩০ নভেম্বর সকাল ১০টায় রাজাকারদের সহায়তায় ১৮ জন মানুষকে নির্মমভাবে গুলি করে হত্যা করা হয়। পরে তাদের সেখানে মাটিচাপা দেওয়া হয়। এছাড়া এই উপজেলার মধইল গ্রামে ২ জনকে, আমন্তপুর গ্রামে ৫ জনেক, গগণপুর গণহত্যায় ৪ জনকে, দুর্গাপুর জঙ্গলপাড়ায় কমপক্ষে ৭ জনকে হত্যা করা হয়।

আত্রাই উপজেলায় তারাটিয়া গণহত্যায় ১০ জনকে, মহাদিঘী গণহত্যায় ৭ জনকে, জালুপোঁওয়াতা কচুয়ার গণহত্যায় ১২ জনকে, পাইকড়া গণহত্যায় ৭ জনকে গুলি করে ও কুড়াল দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। সিংসাড়া গ্রামে ২৫ মে রাতে হামলা চালিয়ে প্রায় ২৮ জনকে হত্যা করে গণকবর দেওয়া হয়। মিরাপুর গ্রামে ১১ জুলাই সকাল ১০টায় পাক বাহিনী আক্রমণ করে ২৫ ব্যক্তিকে গুলি করে হত্যা করে। তাদের সেখানে একটি গণকবরে মাটিচাপা দেওয়া হয়।

ধামইরহাট উপজেলার দু’টি বধ্যভূমি রয়েছে। এসবের মধ্যে ১৯৭১ সালের ১৪ আগস্ট কুলফতপুর গ্রামে মাঠে কৃষি কাজ করার সময় ১৮ জনকে এবং পরে কুলফতপুরসহ আশপাশের কয়েকটি গ্রামের ১৪ জনকে নির্মমভাবে গুলি করে হত্যা করে গণকবর দেওয়া হয়। অপরদিকে উপজেলার পাগলা দেওয়ান গ্রামে প্রাপ্ত একটি গণকবরে অসংখ্য মানুষের মাথার খুলিসহ হাড় পাওয়া গেছে।

নিয়ামতপুর উপজেলার ভাবিচা গ্রামে ১৯৭১ সালের ১ মে ১০-১১টায় ৩ জনকে গুলি করে হত্যা করে এবং ২৯ সেপ্টেম্বর ভোর ৫টায় একই উপজেলার কাড়ালিপাড়া সোনারপাড়া গ্রামে ৬ ব্যক্তিকে গুলি করে হত্যা করে গণকবর দেওয়া হয়।

সাপাহার উপজেলায় সাপাহারমুক্ত করার সম্মুখযুদ্ধে ১৫ জন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন। অপরদিকে জেলার পোরশা উপজেলার শিষা গণপতিপুর গ্রামে ২৪ এপ্রিল ৪ জনকে গুলি করে হত্যা করা হয়।

একুশে পরিষদ নওগাঁর সাবেক সাধারণ সম্পাদক এম এম রাসেল বলেন, ৬৭টির মতো বেশি স্থান চিহ্নিত করেছি। সেই জায়গাগুলো ক্রমেই বিলীন হয়ে যাচ্ছে, নিশ্চিহ্ন হয়ে যাচ্ছে। সেখানে বাড়ি-ঘর, দালানকোঠা নির্মিত হচ্ছে। তাই যেখানে স্মৃতি ফলক নাই, সেখানে স্মৃতিফলক নির্মাণ ও শহীদদের স্বীকৃতি প্রদান এবং রাষ্ট্রীয়ভাবে গণহত্যার দিবস সমূহ পালন করার দাবি জানান তিনি।

মুক্তিযুদ্ধকালীন আঞ্চলিক কমান্ডার ও সাবেক সাংসদ বীর মুক্তিযোদ্ধা ওহিদুর রহমান বলেন, ২৫ মার্চ পাকবাহিনী নিরীহ বাঙালিদের উপর নৃশংসতম গণহত্যা চালায়। সেদিন ইপিআর পুলিশ যারা ছিল যুবক সর্বস্তরের মানুষ প্রতিরোধ গড়ে তুলে। বাঙালি জাতির সত্যের বিকাশে বিশেষ ভূমিকা রেখেছিল। আর গণকবরগুলোর বিষয়ে সরকারের কাছে আবেদন করা হয়েছে সেগুলো দৃষ্টি নন্দনের জন্য।

বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদ নওগাঁ জেলা ইউনিটের সাবেক কমান্ডার হারুন-আল-রশিদ বলেন, এই স্তম্ভগুলো যদি তৈরি করা যায় তাহলে তাদের অস্তিত্বে প্রমাণ হবে যে বাংলাদেশে স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ হয়েছিল। তারা না থাকলেও প্রজন্মের পর প্রজন্ম জানতে পারবে যুদ্ধে এই মানুষগুলো এখানে আত্মহুতি দিয়েছে।

তিনি আরও বলেন, জেলার যেখানে বধ্যভূমি আছে সেগুলোতে আমরা প্রাচীর ও স্মৃতিফলক করার জন্য চেষ্টায় আছি। ১৯৭১ সালের গণহত্যার স্মারক হিসেবে গণকবর ও বধ্যভূমিগুলো সংরক্ষণের দাবি জেলার ইতিহাস সচেতন মানুষের।